সাম্প্রতিক

বৃষ্টির ঘনছাটে কাচের সময় । কাওসারী মালেক রোজী

হরিণ তোমার মত

তোমার শরীর দারুচিনির গন্ধ
হরিণ তোমার মত,
তুমি দাঁড়াও লম্বা পাতার ঝাড়ে
উড়ে বেড়াও  হলুদ সবুজ ঘাসে,
পর্দা খুলে বাইরে যখন আসো
কে হাটে— কে হেঁটে গেল দলে
পায়ের চিহ্ন রেখে,
তৈরি হলো হরিণ হাঁটা পথ। 

দমকা হাওয়া মেঘের চাবুক হরিণ লাফায়
গাছের তলায় চাঁদের ছায়ায় খোঁজে কচি পাতা,
গোলাপ কাটার নরম দলে মাংস সুবাসিত
হরিণ  চিবায় কান্ড পাতা ফুল,
বিষ রেখে যায় হরিণ হারায় বনে—
নীলরঙা গাছ- মৃত্যু ঢলে পরে।
গোলাপ নয় হরিণ নয়—
তোমার শরীর কাঁচা লঙ্কার মত
তোমার শরীর দারুচিনির গন্ধ
হরিণ তোমার মত।

বৃষ্টির  ঘনছাটে কাচের সময়

পাহাড়ের পাদদেশে ঘরপাতা সহজ না
অরণ্য কিংবা সমুদ্রের গোনা উতলানো ঢেউ মোকাবিলা করে
বানে ভাসা পিঁপড়া জড়াজড়ি করে ওলট পালট,
মানুষ এখন মানুষ নয়
ভীত হরিণীর ছোটা সময়ের
হাওয়া হওয়া নক্ষত্র।

জ্ঞানী  আর অজ্ঞানী ইদানিং মুখ লুকিয়ে রাখে
প্রকৃতির  বায়ু আর নিষ্পাপ নয়,
উড়ে যায় আবাবিল পাখির ঠোঁটে দুঃখিত মন্ত্র চারিদিকে পিঠাপিঠি।
সময়ের শতভাগ প্রার্থনা,  ঘন জল ঘূর্ণি জলের শীত
রকে বসে থাকে অচেনা বীজ
যে যায় পথে, নেচে চলে মৃত্যু,  জরা,  বিবশ স্বাদ।

পাহাড়ি স্রোতে আকাশ ফুঁড়ে ঠিকানাহীন
নতুন অসুখ হাঁটছে সারা শহরতলী।

অচেনা গ্রহের সন্ধান মিলেছে যেন
পৃথিবী আজ শরীর খুলেছে নিজের
মুখে নাকে খোলস ,চুলে টুপি, হাত মোজায় হাতের শরীর ঢাকা
নভোচারী নামে আউলা পৃথিবী মহামারী ঘাটে।

কিবলামুখী দরজায় বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষ
এখন সবার ঘরের দিকে ধাওয়া,
ঘর পাতা কোন পাহাড়ের পাদদেশে,অরণ্য সমুদ্র অন্য কোথাও
একাকার বৃষ্টির   ঘন ছাটে— ওরা মুছছে  কাচ
নতুন ছায়া নকশা কাটবে পৃথিবী ঝালরে।

ভিক্ষুকের মুখ

বছর মাস দিন ঘন্টা মিনিট মুহূর্ত নেই
আলো অন্ধকার  নেই,
আকাশ ছেঁড়া সূর্য চাদ, কেবল উড়ে যাওয়া উড়াল পাখি।
কত শতাব্দীর নিরব পাথর
হাত-পা-মাথা মুখ চোখ সব আছে- দেখতে পাই ,ঘ্রাণ পাই
শুনতে পাই পাতা ঝরার মন্ত্রশব্দ ।

পৃথিবী বিক্রি করার মূল্যেও আমি উঠতে বসতে দাঁড়াতে হাঁটতে পারি না
বিশাল জাহাজ আচমকা ধাক্কা দিয়েছিল,
ক্লান্ত আমি উড়তে উড়তে ডুবতে  ডুবতে নিথর
ভেঙ্গে পড়া ঢেউ সাগরের চিহ্ন, আমি  হারানো ঢেউ খুঁজি।

খুঁজছি নিজেকে ঘরে বাইরে,একা অনেকের ভিড়ে
এক সময় পেলাম, আমি কিছু না,সাধারন গল্প আমার
অতি চেনা ভিক্ষুকের মুখ।
কযুগ পর ঘরে ফিরে দেখলাম সবাই বদলে গেছে
শক্তপোক্ত ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট দোকানপাট, নড়বড়ে স্মৃতিরা  আর নেই
ঘর বলল আমিও বদলে গেছি ।

সাদা ফকফকে জোছনা বুকের ভেতর, অনেকদিন  কড়া নাড়া
রাত হলেই মহাসড়ক দরজায় এসে দাঁড়ায়—
ঘরে চলো,  ভুলভুলানি  ঘর কোথায়।
রাতগুলো সুনসান কবরস্থান,  দীর্ঘ রাত পাড়ি দিতে হবে একা,
একা শুয়ে থাকা।

ঘুলঘুলির চাঁদে তেকোনা  চিকন আলোয় চোখ  ধাঁধায়
দূরে সন্ধ্যার ডুবন্ত ছায়া,
ডুব ডুব কবর একের পর এক  সাজানো
শেষের গুলো দেখা যায় না কুয়াশা আড়াল,
হুম হুম পাখির শব্দে ঘুমন্ত রাত।

টিকিট হাতে মানুষ চলে যায় নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ট্রেনে জানিনা শহরে,
জানিনা শহরে যে ট্রেন যায় সে তো ফেরে না,
হুইসেল শোনা যায় দূরে, বুকে হেঁটে  আসে ট্রেন
আমার মত যাত্রীরা দাঁড়িয়ে গেল সম্পুর্ণ খালি হাতে।

নিরাশ্রয় এই প্লাবনের আয়োজনে নির্জন জানালা পাশে বিশ্বাসী বুননে
সহসা স্রষ্টাকে পাই, কেঁপে কেঁপে ওঠে বন্ধ দরজা।
আমি আঁকিয়ে—প্লাবন বাতাসে আমার মুখ   আঁকছি
নির্মল রোদ রাতের মশারি তুলে ফেলে,
ছিন্নমূল বকুল সুগন্ধি— ধুয়ে দেয় ব্যর্থতা
গাট্টা বিশ্বাস পান্ডুর হাত ধরে,
বিশ্বাসের  বেদী আমার উদ্ধার
একদিন দাঁড়াবো হাটবো দৌড়াব রাস্তায়,
আঁকা ছবিটি বেচবো ক্রেতা খুঁজছি,  নেমে  এসো আমার সমান সমান
এখনো দিন শেষ হয় নাই, আলো রোদে ভেজা  বাতাস
আছে বৃষ্টির নোনা স্বাদ, গরম মাটির গন্ধ বাতাস।

কাচের ওপার এপারের পদাবলী 

কাচের ওপারে   শিমুল  ওড়া নকশাকাটা আকাশ,
একান্তে হারানো শোকের সাদা শব্দহীন পৃথিবী
ঘষামাজা নক্ষত্র উজ্জলতায়  হাত নাড়ছে,
উড়ছে চুল, উঠছে ধুলো খইয়ের শরীর—
ছুটছে গাড়ি  নড়ছে ঠোট অনর্গল।
কথারা হাসে লুটোপুটি পথে রঙিন ঘুড়ির  আড়ালে,
তুমুল তর্ক কঠিন সমীকরণে ছুুড়ছে বাতাস,
দুলে দুলে ওরা হাটে– হাঁটতে থাকে নির্ভার আলোয়।
ফোন বাজে তীক্ষ্ণ গুনটানা সংগীতে,
তড়িৎ সান্নিধ্য পাওয়া মুঠোফোন দিগন্ত নীল প্রেমে নৌকা ,
সুবিশাল জগতকে উপেক্ষা করে কাফেলায়  কাকেরা
বেমালুম ব্যস্ত শস্য দানার খোঁজে।
শুরু থেকে শেষ পথের উপর সুটকেস, সাইকেল, বাধা কুকুর
টেনে নেয় কেউ,
হাঁটতে হাঁটতে নাগরদোলার মত হাতের পাঁচটি আঙুল নাড়িয়ে
জুঁই ফুলের প্রতিবিম্বের মত ছড়িয়ে রাখে কথা ,
প্রচন্ড কোন সম্ভাবনায় পাতারা চির চির দোলে পাগলা বর্ষায়,
কাচের ওপারে এইসব কদম ফুলের মত ভিজতেই থাকে।

কাচের এপারে রেস্টুরেন্ট
আকস্মিক শিউরে ওঠা হিম হওয়া ঘরে
অবলীলায় ছুটে আসা সাগরের ঢেউয়ের আছড়ে পড়া শব্দ,
পথ আগলে দাঁড়াবার সুর হালকা হাওয়ার রঙে জাগায় নেশা।
ডানে-বাঁয়ে চতুর্দিকে জাদুকর ওয়েটার পায়ের উপর ঘুরছে
মুঠো খোলা হাতের থালায়, খাবারের রঙ আর সুবাস— চিনিয়ে দেয়  স্বাদ,
স্পর্শ কাতর রসনা জিকির করে খাদ্য  ধ্যান,
কাঁচের ভেতর, ভরা পকেটে কার্ড আর  নোটেরা ঘুমায়,
কাচের বাইরে অচিন পকেট, ভরা কিংবা খালি— কেউ জানে না ,
কাচের ওপারে নিঃশব্দ গতি— ট্রেনের গভীর চলা
কাচের এপারে শব্দে শব্দ— গ্লাস ভরা  তৃষ্ণার আস্তরণ ।

কেবল মানুষ

কত কাক কত ঘর কত গাড়ি কত রঙের মানুষ
মানুষ আর মানুষ,
এদিক ফিরি ওদিক ফিরি- কেবল মানুষ মানুষ আর মানুষ
মানুষের অন্তরে মানুষ।
রোদ্দুরে ছায়ায়, বুকের গোপন কিংবা কবাট খোলা বারান্দায়
সর্বব্যাপী বুদবুদের মত মানুষ ,হেঁয়ালির চাকা ধরে দাঁড়িয়ে
জলরাশির উপচানো  কায়ায় আসীন মানুষ।

কোলাকুলি গলাগলি চাঁদমুখ সোনামুখ
হাসি মুখ আকার নিরাকার,
ক্লান্ত ঢালু বেয়ে জলে ডুব দেওয়া রাতপেঁচা
উড়ে যায় পাখার ভেতর । ডিমের আকার পৃথিবীতে
বাস করে কেবল মানুষ ।

বৈশাখ থেকে চৈত্র মাস সোনামুখী সুইয়ে বুনে যায়
নিটোল আচল ঘর পেতে শুয়ে থাকা মানুষ ।
দিনের এপারে সূর্য ওপারে নীল শীত চাঁদ
মাঝখানে তারার জরি বোনে- নিখুঁত কারিগর
নিখুঁত ব্যাকরণ।

কত গাছের আড্ডা, রোদের ঝলসানো  ঢেউয়ে
বেয়ে ওঠা পিঁপড়ার  সার। পানির শব্দে ঘুঙ্গুর বাধা
সাতসকালে পাখির ডাকাডাকি, কাঠঠোকরা কি খোজে
ঠুকঠুক ঠুকঠুক আওয়াজে। এই ফাঁকে
অবিবেকী কতজন অপ্রস্তুত করে সহজ জোছনাকে।

বিছিয়ে রাখে রাতের বারান্দায় দুঃখ নকশি কাঁথা
চোখের আর্দ্রতায়  জ্বালে পিদিম, বিচিত্র  মুখোশে
ঢাকে ভয়াল আবায়ব ,টানেলের ভেতর ঘর
মনের বধ্যভূমিতে চাষাবাদ করে আত্বার পাপ লাঙ্গলে।

ওরা মানুষ,  মানুষ আর মানুষ, চারিদিকে মানুষ
জড়ো  হওয়া সিঙ্গার ফুৎকারে।

এরাও মানুষ যেখানে পদ্মের সুললিত উচ্চারণে
লাল গোলাপি পোষা হরিণ বাঁচে,
সুন্দর অনবরত সুন্দরের জন্ম দেয় ,ওরা ঘুমিয়ে থাকে
দেখেনা কত দুরদার লতা নিদ্রাহীন
বেড়ে ওঠে আগাছার  ঝাড়ে। এদিকে  ছাট
ওদিকে  ছাট  লাভ নেই, ইতিউতি দিয়ে
ফোকর  কাতর ফাঁকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকে।
পালানো ফুল হাতে কত দিন রাতে, কত মানুষ
খোঁজে একরক্তি জমি. সেখানে পুঁতে রাখা যায়
জীবনের বীজ,
সামান্য শরীরের অস্তিত্ব ছাড়া কিছুই বাঁচে না,
ইচ্ছে মমতা ভালোবাসা কেউ না। কেউ বাঁচে না
জনতা ভিড়  দেশে।

মানুষ মানুষ বিচিত্র মানুষ, এদিক  ফিরি ওদিক ফিরি
কেবল মানুষ,
কত গাছ কত পাতা কত মাটি কত পথ কত রঙের মানুষ
মানুষ আর মানুষ  কেবল মানুষ,
রঙ্গিলা মেলায় বাঁশের বাঁশিতে ফু দেয় এই মানুষ
হাওয়াই মিঠাই হাতে  চরকি দোলায় চেপে বসে
এরপর একবার নামে, একবার ওঠে-একদল হারিয়ে যায়
অন্যদল জন্ম নেয় সাদা সুর্যের ভোরে।

Comments

comments

কাওসারী মালেক রোজী

চিকিৎসক ও লেখক। চাকরির সুবাদে আফ্রিকা, সৌদি আরব ও আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে বসবাস করে স্থিত হয়েছেন ফিলাডেলফিয়ায়। পিছনের সময়ে ইত্তেফাক, কচি কাঁচার আসর , কতকথার আসর, রবিবার পত্রিকা, বেগম এছাড়া রেডিও বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমেরিকার ঠিকানা ও সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকায় তিনি চেনা মুখ। প্রকাশিত কবিতার বই - মাঝ নদীতে বাড়ি।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি