সাম্প্রতিক

ডেভ এগার্স এর অণুগল্প । আলম খোরশেদ

রড্রিক আশা করে

রান্নাঘরে রড্রিক, আশা করছে। এনরন কোম্পানির উপহার দেওয়া কফি-মগে সে জাম্বুরার রস ঢালছে, আর আশা করছে প্রবল মানসিক প্রচেষ্টায়। সে জানে যে, তার স্ত্রী জ্যানিস, শিগগিরই ঘুম থেকে উঠবে, তারপর বাথরুমে কয়েক মিনিট কাটাবে, বাথরুমে কাটানো সেই কয়েক মিনিটের পর সে রান্নাঘরে, তার দিকে হেঁটে আসবে, এবং সেই সময়, প্রবল সম্ভাবনা যে, কাল রাতে তার কত অল্প ঘুম হয়েছে এই নিয়ে কথা বলতে শুরু করবে। রড্রিক আশা করে, এমনই জোরের সঙ্গে যে তার পা-জোড়া শব্দ করে, যেন সে আজ অন্তত এই কথাটা না বলে।

জ্যানিস ও রড্রিকের বিয়ে হয়েছে কয়েকমাস হলো, বিয়ের আগে তারা একসঙ্গে থাকেওনি, ফলত বিবাহের পূর্বে, জ্যানিসের এই অভ্যাস সম্পর্কে, প্রত্যেকদিন সকালে তার ঘুম না হওয়ার কথা জানানো, সে অজ্ঞই ছিল। তার এই তথ্যপ্রদান প্রক্রিয়ার মধ্যে কিছুটা বৈচিত্র্য থাকে অবশ্য— ”কাল রাতে আমার এক ফোঁটা ঘুম হয়নি”; ”মাথাভরা যন্ত্রণা নিয়ে আমি সারারাত জেগে ছিলাম”; ”ভোর চারটার আগে আমার ঘুম আসেনি, কিন্তু ঠিক পাঁচটাতেই আবার সেটা ভেঙে যায়”— তবে তথ্যটি সে জানায় ঠিকই, প্রত্যেক সকালে নাস্তার সময়, এমনটাই আশা করে যে, প্রথমত রড্রিক এই বিষয়ে আগ্রহী, দ্বিতীয়ত সে এটা বিশ্বাসও করবে, যদিও রড্রিক ভালো করেই জানে, জ্যানিস ঠিক তার সমান সমানই ঘুমায়, যেটা একজন গড়পড়তা মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ।

এটা কি এতটাই পরিচ্ছন্ন একটা সমাধান হতে পারে বা হওয়া উচিত? তার চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়, এক অনিচ্ছুক হাসি এসে তার মুখে ভর করে, সমাধানটা কী হতে পারে— ২০টি অ্যাম্বিয়েন, না কি ৩০টি না আরও বেশি— আর যদি সে সফল হয়, এমনকি ধরাও পড়ে, কোনো জুরি কি তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে? সে শীতল চামচটি মুখের কাছে এনে তরমুজের টুকরোগুলো শুষে নেয়। সে ঠিক সেই সময়েই মুখ তুলে দেখতে পায় জ্যানিস ধীরগতিতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। ”একজন সুখী ও নিদ্রাতৃপ্ত মানুষকে দেখো,” সে এমন তীর্যকভাবে কথাটা বলে যে, ঘরের দেয়ালগুলো পর্যন্ত বেঁকে আসে ভেতরে। ”তোমার যে সুখ, আমি কি কোনোদিন সেই সুখের স্বাদ পাবো?” সে ভুরু নাচিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে। রড্রিক মাথা নাড়ে। ”পাবে, খুব শিগগিরই পাবে, প্রিয়ে।”

ফলত রড্রিক তার বেগেলে মাখন লাগায় এবং আশা করতে থাকে। সে তার বেগেলে একটু জ্যামও লাগায় এবং প্রত্যাশা করতে থাকে। তারপর সে বিছানার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শুনতে পায়, দরজার নব নড়ার শব্দ পায় এবং জ্যানিসের বাথরুম প্রবেশের দৃশ্য দেখে। আর খুব বেশি দেরি নেই, তাকে জ্যানিসের এই বিরক্তিকর তথ্যটা জানানোর, সে ভাবে। ”হে খোদা, কী ক্লান্তই না আমি,” সে বলবে আর অম্নি  চাবুক-খাওয়া বন্দির মতো কুঁকড়ে যাবে রড্রিক। সে কীভাবে জ্যানিসকে বলবে, ভদ্রভাষাতেই, যে তার ঘুম হওয়া কিংবা না-হওয়া বিষয়ে খোদার কসম তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই? সে কি তার নিদ্রাহরণকারী শক্তিদের দোসর বলে ভাববে নিজেকে? জ্যানিস কি আশা করে যে, সে যেন আরও বেশি করে ঘুমাতে পারে তার জন্য কিছু একটা করবে? রড্রিক সারাটা জীবন অপরাধী বোধ করতে অস্বীকার করে তার নিজের এই সুখনিদ্রাটুকুর জন্য, যখন জ্যানিস ঘুমাতে পারে না, যদিও সে ঘুমায় ঠিকই, এবং সিদ্ধান্ত নেয়, সে যখন এতই ঘুমাতে চায় তাহলে সে তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে কিছু একটা করবে। কতরকম ঘুমের অষুধই তো রয়েছে- টাইলেনল পিএম, অ্যাম্বিয়েন, কোডিন, মরফিন— যা সে তার সান্ধ্যকালীন হট চকলেটের গ্লাসে চুপিসারে মিশিয়ে দিতে পারে (কেননা জ্যানিস অষুধ জাতীয় কোনোকিছুই খেতে চায় না, এমনকি অ্যাসপিরিনও)।

তরমুজ কেটে ফালি করতে করতে সে জ্যানিসের সমস্যার একটা সম্ভাব্য স্থায়ী সমাধানের কথা ভাবে, এবং নিজেই নিজের কাছে ধরা পড়ে। তার এই হারানো ঘুমের বিষয়ে প্রতিদিনের অভিযোগমালা কি রড্রিককে বাধ্য করতে পারে তাকে অসীম কোনো নিদ্রার দিকে ঠেলে দিতে? এটা কি এতটাই পরিচ্ছন্ন একটা সমাধান হতে পারে বা হওয়া উচিত? তার চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়, এক অনিচ্ছুক হাসি এসে তার মুখে ভর করে, সমাধানটা কী হতে পারে— ২০টি অ্যাম্বিয়েন, না কি ৩০টি না আরও বেশি— আর যদি সে সফল হয়, এমনকি ধরাও পড়ে, কোনো জুরি কি তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে? সে শীতল চামচটি মুখের কাছে এনে তরমুজের টুকরোগুলো শুষে নেয়। সে ঠিক সেই সময়েই মুখ তুলে দেখতে পায় জ্যানিস ধীরগতিতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। ”একজন সুখী ও নিদ্রাতৃপ্ত মানুষকে দেখো,” সে এমন তীর্যকভাবে কথাটা বলে যে, ঘরের দেয়ালগুলো পর্যন্ত বেঁকে আসে ভেতরে। ”তোমার যে সুখ, আমি কি কোনোদিন সেই সুখের স্বাদ পাবো?” সে ভুরু নাচিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে। রড্রিক মাথা নাড়ে। ”পাবে, খুব শিগগিরই পাবে, প্রিয়ে।”

.  .  .

লেখক পরিচিতি: সমকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন অত্যন্ত সক্রিয়, চৌকস সাহিত্যিক ডেভ এগার্স এর জন্ম ১৯৭০ সালে। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এগার্স একাধারে ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, গদ্যকার, শিশুসাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার, সংগীতশিল্পী, চিত্রকর, সম্পাদক, প্রকাশক ও সাহিত্যসংগঠক। উত্তর আধুনিক ধারার এই সতত নিরীক্ষাপ্রবণ লেখকের সাহিত্যকর্মের মূল প্রবণতা  মার্কিন সমাজের নরনারীর আন্তঃসম্পর্কের স্বরূপ, নানাবিধ সামাজিক অসঙ্গতি, ব্যক্তির মনোজগতের জটিলতা ইত্যাদির শৈল্পিক ও শ্লেষাত্মক উপস্থাপনা এবং সূক্ষ্ম সমালোচনা। অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যপুরস্কারে ভূষিত এই লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে: Mistakes We Knew We Were Making (2000), You Shall Know Our Velocity! (2002), Jokes Told in Heaven About Babies (2003), Your Fathers, Where Are They? And the Prophets, Do They Live Forever? (2014), The Museum of Rain (2021)  ইত্যাদি।

আলম খোরশেদ

জন্ম : ২১শে সেপ্টেম্বর, ১৯৬০, কুমিল্লা। শিক্ষা : যন্ত্রপ্রকৌশলী, বুয়েট, ঢাকা। বর্তমানে স্বনির্মিত শিল্প-সংগঠন ’বিস্তার: চিটাগাং আর্টস কমপ্লেক্স’ পরিচালনার কাজে পূর্ণকালীনভাবে নিয়োজিত। ইমেইল: bistaar@yahoo.com প্রকাশিত গ্রন্থাবলি # জাদুবাস্তবতার গাথা : লাতিন আমেরিকান ছোটগল্প সংকলন, # ভাবনাগুচ্ছ: হেনরি মিলার, # বোর্হেসের সঙ্গে কথোপকথন: ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, # নিজের একটি কামরা: ভার্জিনিয়া উল্ফ, # ত্রিশটি কবিতা: নোবেলবিজয়ী ভিস্লাভা শিম্বর্স্কা, # দূর দিগন্তের ধ্বনি, # নাগিব, বোর্হেস, চিনুয়া, মার্কেস ও অন্যান্যের গল্প, # দ্বাদশ কাহিনি: সমকালীন বিশ্বের গল্প, # মানবীমঙ্গল: নারীবাদী গল্প সংকলন, # নির্জন নিশ্বাস: নারীবাদী কবিতা সংকলন, # দক্ষিণী ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য গল্প, # গির্জাবিয়ে: ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, # দ্বিতীয় লিঙ্গের পরে: সিমোন দ্য বোভোয়ার, # চলচ্চিত্রের কথকতা, # নাটক বিষয়ে, # ন্যুয়র্ক-নিসর্গ, # অচেনা অক্ষর, # পঠন-পাঠন, # ভাষা, নারী, সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, # কাটা জিহ্বার কথা : বাংলাদেশের নারীবাদী গল্প-সংকলন, # দ্য জাগুয়ার স্মাইল: নিকারাগুয়া ভ্রমণ-গাথা (সালমান রুশদি),

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি