সাম্প্রতিক

কবিতায় নীল দাগ । রিনা মাইতি

ববিতাদের আবাসনে আজ উৎসবের আমেজ, গেট-টুগেদার। উফ্, ববিতার যে কি আনন্দ হচ্ছে সে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। প্রতিবেশীরা যারা এখন এখানে থাকে না তারাও আজ আসছে। ফোনে যোগাযোগ থাকলেও কত বছর পর সকলের সঙ্গে দেখা হবে। উত্তেজনায় ও মাঝে মাঝেই মেন গেটের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে।

একে একে সকলেই উপস্থিত। কমিউনিটি হলে সান্ধ্যকালীন জমাটি আড্ডা। বাচ্চাদের জন্য আকর্ষনীয় খেলা ও গান বাজনার আয়োজন। সুপ্তিদিকে পেয়ে ববিতার আনন্দ আর ধরে না। আসলে ওরা একসঙ্গে কলেজের হোটেলে থাকত। সুপ্তিদি দু বছরের সিনিয়র কয়েকটা মাস এই আবাসনে থাকার পর সুপ্রিদিরা সপরিবারে কন্যাকুমারী চলে যায়। ফোনে ববিতা জানিয়েছিল যে সে এখন নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতা ও গল্প লেখে। এর মধ্যে তার একটি কবিতা ও একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। সুপ্তিদি ভীষণ অবাক হয় এবং বই দুটি দেখার তাগিদেই আজকের অনুষ্ঠানে চলে এসেছে। সুখিনি কয়েকদিন হলো কলকাতায় মায়ের কাছে এসেছে। ববিতা ও সুপ্রিদির কথার শেষ নেই। সুপ্তিদি আর অপেক্ষা করতে পারে না।

—কই, বইগুলো দে। আরে জানিস না আমি কি প্রচÐ উত্তেজিত তোর বইগুলো পড়ার জন্য। সকলের সঙ্গে দেখা হবে, এটা তো আছেই কিন্তু তার থেকেও বড় কথা তোর লেখা বই। আর এজন্যই এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে পারলাম না।

— দিদি সত্যি বলছ! আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।

রবিতা সুদৃশ্য একটা প্যাকেট সুপ্তিদির হাতে তুলে দিল। সুপ্তিনি মুহূর্তেই প্যাকেট থেকে বই দুটি বের করে।

কি দারুন! হ্যাঁরে ববিতা, তোর এত প্রতিভা ছিল কোনোদিনই তো জানতাম না। কবে থেকে লেখা শুরু করলি? হোটেলে কোনোদিন তো তোকে লিখতে দেখিনি। আমি তো আর তোর মতো চাকরি করি না তাই অবসরে বই আমার একমাত্র সঙ্গী। আমি ভীষন খুশি। আরও অনেক লেখ। নতুন বই প্রকাশ হলে আমাকে অবশ্যই জানাবি। আগামীকাল ভোরের ফ্লাইটেই ফিরে যাব তাই এখান থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরতে হ বুঝলি।

সুপ্তিদি সকলের সঙ্গে দেখা করল। গান গাইল। ববিতা আবৃত্তি করল। সুপ্তিনি নিজের ফ্ল্যাটটা এরই মধ্যে একবার ঘুরে এল। হই হই করে আড্ডা শেষে সকলে খেতে বসল।

এর স্থান মাহাত্ম্য এমনই যে মনকে শান্ত, সংযত করে। এই সৈকতে নেমে স্নানের মাধ্যমে মানুষের পাপ মুক্ত হয়ে পুণ্যলাভের কাতরতা দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়। বিবেকানন্দ রক থেকে দৃষ্টি ফেরাতেই পারি না। সমস্ত গøানি এক লহমায় দূর করে। এ এক অন্য অনুভূতি।

ভাঙা হাটের মতো বিষাদের সুর, এবার যেতে হবে। অনেকের সঙ্গে সুপ্তিদিও বিদায় নিল। কয়েকদিন পর ববিতা সুপ্তিদিকে ফোন করে।

দিদি কেমন আছো? কি করছ এখন?

—ভালো আছি বে। তোর বইগুলো পড়লাম। খুব খুব ভালো লিখেছিস। এত সুন্দর গ্রামীণ পেক্ষাপট, অসাধারণ। সুন্দরবনের গ্রামের এত সুন্দর বর্ণনা পড়ে আমি একেবারে বাকরুদ্ধ। মন ছুঁয়ে যায়। মনে হল তুই ঐ এলাকায় দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। আর কিছু লিখেছিস? আমাকে পাঠিয়ে দিবি। লেখাটা বন্ধ করিস না।

—নাগো দিদি এখন আর সেভাবে লেখার সময় পাচ্ছি না। তবে যেসব কবিতাগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো তোমাকে পাঠিয়ে দেব। দেখবে এখনকার লেখাগুলো অনেক পরিণত। তুমি এখন কি করছ?

—বাগানে গাছের পরিচর্যা করছি। আমাদের বাড়িটা একটা বাংলো টাইপের বিশাল এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। একটা ছোট্ট পুকুর আছে মাঝখানে। আর আছে সান বাঁধানো একটা ঘাট। প্রয়োজন মতো মাছ এখান থেকেই ধরা হয়। গাছ ভর্তি আম। এইতো আম পাকতে শুরু করেছে। একদিকে অর্গ্যানিক সবজি ক্ষেত। আর একদিকে ফল ও মৌসুমী ফুলের বাগান। বাজার থেকে সবজি, মাছ, ফল প্রায় কিনতেই হয় না। প্রচুর পাখি আর ময়ূর আগে বাগানে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। ওরা সারা বাগান ঘুরে বেড়ায়। আমার

বাগানের গাছগুলো আর এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনকে সবসময় সতেজ রাখে। দিনি তুমি ভীষণ লাকি। স্বল্প নে হচ্ছে। তোমার ওখানে একবার বেড়াতে যাব।

ভাঙা হাটের মতো বিষাদের সুর, এবার যেতে হবে। অনেকের সঙ্গে সুপ্তিদিও বিদায় নিল। কয়েকদিন পর ববিতা সুপ্তিদিকে ফোন করে।

দিদি কেমন আছো? কি করছ এখন?

—ভালো আছি বে। তোর বইগুলো পড়লাম। খুব খুব ভালো লিখেছিস। এত সুন্দর গ্রামীণ পেক্ষাপট, অসাধারণ। সুন্দরবনের গ্রামের এত সুন্দর বর্ণনা পড়ে আমি একেবারে বাকরুদ্ধ। মন ছুঁয়ে যায়। মনে হল তুই ঐ এলাকায় দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। আর কিছু লিখেছিস? আমাকে পাঠিয়ে দিবি। লেখাটা বন্ধ করিস না।

—নাগো দিদি এখন আর সেভাবে লেখার সময় পা”িছ না। তবে যেসব কবিতাগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো তোমাকে পাঠিয়ে দেব। দেখবে এখনকার লেখাগুলো অনেক পরিণত। তুমি এখন কি করছ?

—বাগানে গাছের পরিচর্যা করছি। আমাদের বাড়িটা একটা বাংলো টাইপের বিশাল এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। একটা ছোট্ট পুকুর আছে মাঝখানে। আর আছে সান বাঁধানো একটা ঘাট। প্রয়োজন মতো মাছ এখান থেকেই ধরা হয়। গাছ ভর্তি আম। এইতো আম পাকতে শুরু করেছে। একদিকে অর্গ্যানিক সবজি ক্ষেত। আর একদিকে ফল ও মৌসুমী ফুলের বাগান। বাজার থেকে সবজি, মাছ, ফল প্রায় কিনতেই হয় না। প্রচুর পাখি আর ময়ূর আগে বাগানে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। ওরা সারা বাগান ঘুরে বেড়ায়। আমার

বাগানের গাছগুলো আর এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনকে সবসময় সতেজ রাখে। দিনি তুমি ভীষণ লাকি। স্বল্প নে হ”েছ। তোমার ওখানে একবার বেড়াতে যাব।

—জানিস আমার বাড়ি থেকে কি অপরূপ সূর্যাস্ত দেখা যায়। আরব সাগরের জলে তখন রঙের বন্যা। একা গোধূলিই মনকে মোহিত করে দেয়।

তোমার বাড়িটা কি পাহাড়ের ওপরে? আমি একবার যাবই দেখবে। পাহাড় আমার ভীষণ ভালো লাগে।

এদিকটা পশ্চিমঘাট পর্বতের অংশ। তাই এখানকার ভূপ্রকৃতিটাও উঁচু নিচু। আমাদের বাড়িটা পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে অবস্থিত। বাড়ি থেকে বাগানটা ধীরে ধীরে সমুদ্রতীরে নেমে গেছে। পার্বত্য অবস্থানের জন্য এখানে তটভূমি নেই। এখানে সমুদ্রে নামা যায় না। সকাল-বিকাল সমুদ্রের কলতান মেশানো বাতাস মনে নেশা ধরায়। তাই প্রত্যেক সকাল বিকাল আমরা বিচ রোড বরাবর হাঁটি। বেকে বসি। সমুদ্র আমাদের সঙ্গ দেয়। সময় কেটে যায় একান্তে, নিভৃতে। কখনো হাঁটতে হাঁটতে আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরের সঙ্গম স্থুল কন্যাকুমারীর ত্রিবেণী সঙ্গমে পৌঁছে যাই।

এর স্থান মাহাত্ম্য এমনই যে মনকে শান্ত, সংযত করে। এই সৈকতে নেমে স্নানের মাধ্যমে মানুষের পাপ মুক্ত হয়ে পুণ্যলাভের কাতরতা দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়। বিবেকানন্দ রক থেকে দৃষ্টি ফেরাতেই পারি না। সমস্ত গøানি এক লহমায় দূর করে। এ এক অন্য অনুভূতি।

—তোমার কাছে কন্যাকুমারীর ত্রিবেণী সঙ্গম, বিবেকানন্দ রক, সমুদ্র, তোমার বাড়ি, বাগান সব এর বিবরণ শুনে মনে হচ্ছে এখনি দৌড়ে চলে যাই।

—এই তো কদিন পরেই বর্ষা পড়ে যাবে। এখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়। এখন আসতে পারবি না। -তোমাকে এখনকার লেখা কয়েকটা কবিতা হোয়াটস অ্যাপ এ পাঠিয়ে দিচ্ছি।

ববিতা পুরাতন পত্রিকাগুলো থেকে তার প্রকাশিত অনেকগুলো কবিতার ছবি তুলে সুপ্তিদির হোয়াটস অ্যাপত্র পাঠায়। সঙ্গে কয়েকটি কথা। —দিদি এই কবিতাগুলো কয়েকটা পত্রিকার পুজো ও বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত

হয়েছে। সময়মতো পড়বে। আর অবশ্যই জানাবে কেমন হয়েছে।

কয়েকদিন পর দিদির মেসেজ দেখে ববিতা মহা উৎসাহে পড়তে লাগলো।

—হ্যাঁরে ববিতা, কি ছবি পাঠালি এ তো ডাউনলোড হচ্ছে না। ও হ্যাঁ, দু’টো কবিতা

শূন্যস্থান ও পরিক্রমণ পড়লাম। খুব ভালো লেখা হয়েছে।

— দিদি, এগুলো ছবি নয়। সবগুলোই কবিতা। মাত্র দু’টো কবিতা ডাউনলোড হলো। তোমার হোয়াটস অ্যাপ ফটো গ্যালারী কি ভর্তি হয়ে গেছে? তাহলে অপ্রয়োজনীয়

কয়েকটা ছবি ডিলিট করে দাও। নাহলে ডাউনলোড হবে না।

—আরে না না। ফটো গ্যালারী ঠিকই আছে। এই তো আমার ভাইপো ছবি পাঠালো। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তোর ছবিগুলোই ডাউনলোড হচ্ছে না।

—ঠিক আছে দিদি। আর একবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।

—নারে ববিতা, তোর এখন পাঠানো কোনো ফটোই ডাউনলোড হচ্ছে না।

ববিতা দেখছে দু’বারের পাঠানো সমস্ত কবিতাতেই নীল দু’টো করে দাগ পড়েছে। তার মানে সুপ্তিদি সব কবিতাগুলোই পড়েছে।

. . .

রিনা মাইতি

একটা বাংলা মাধ্যম উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা। জন্ম নিউটাউন, কলকাতা, ভারত। ২১শে জুলাই ১৯৭১ সালে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'সঙ্গে সারাক্ষণ', 'দহ'। গল্পগ্রন্থ 'কিছুক্ষণ', 'সুরের নৌকা'।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Google Plus

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি