সাম্প্রতিক

পোস্ট কয়টাস । সালাহ উদ্দিন শুভ্র

আমার ঠোঁট ফুলে আছে। পিঠেও আঁচড়ের দাগ আছে মনে হচ্ছে। দুপুরে গোসল করার সময় পিঠটা জ্বলছিল। আর এরপর চৈত্রের গরমে মাঝে মাঝে কুট কুট করে উঠছে পিঠটা। লামিয়া আঁচড়ে দিয়েছে নখ দিয়ে। চিংড়ি মাছের খোসার মতো ওর নখ, বড় বড় আর সাদা। আমি পিঠের আর ঠোঁটের তাজা দাগের মতোই একটা গল্প নিয়ে এসেছি রফিক ভাইয়ের কাছে। কাঁটাবনের অফিসের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে তিনি একটা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের করেন। সেখানে এর আগেও আমার গল্প ছাপা হয়েছে। গল্প ছাপা হলে বিল দেন। আমার কিছু টাকার খুব দরকার। রফিক ভাই যদি ছাপতে রাজি হন তাহলে আগাম টাকাটা নিয়ে নেব তার কাছ থেকে–এমন ভাবনা নিয়ে বসে আছি। রফিক ভাই গল্পটা পড়ছেন মনযোগ দিয়ে। তিনি খুব সিরিয়াস সম্পাদক। নিজের নজরের বাইরে কোনো শব্দ ছাপেন না। নিজেই সব করেন। কোনো অ্যাসিসটেন্ট নাই তার। পত্রিকার সার্কুলেশনও ভালো। বিশেষ করে মফস্বলে এর বেশ কদর। মফস্বলের লেখকরা এ পত্রিকায় লেখা ছাপা হলে বেশ বর্তে যান। তাদের লেখক জীবন ধন্য হয়ে যায়। আমার মতো দুর্বল আর্থিক অবস্থার লেখকদেরও ভরসা রফিক ভাইয়ের ‘মলম’। পত্রিকাটার নাম মলম। সাহিত্যকে রফিক ভাই সমাজের উপশমের উপায় বলে ভাবেন। সে জন্য তার পত্রিকার নাম মলম। নিয়মিত বিজ্ঞাপনও পান। নির্দিষ্ট সার্কুলেশনের পত্রিকাটা মোটামুটি ভালোই চলছে। রফিক ভাইয়েরও একটা নেম-ফেম তৈরি হয়ে গেছে। আমলা-প্রশাসনে যাতায়াতের পথ পেয়ে গেছেন। তার সঙ্গে খাতিরটা আমার দিক থেকেই মেনটেইন করি লিখে হাজার দুই-তিন টাকা পাই সে জন্য। আজো এ আশায় আসা। 

তার ঘরে যতই ফ্যান চলুক গরম ভাবটা যায় না। গা ঘামতে থাকে। তাতে মোটেও সমস্যা হয় না রফিক ভাইয়ের আমি দেখেছি। তিনি এসিও লাগান না। ফ্যানের ঘূর্ণিতাল নাকি তার ভালোলাগে। ফ্যানের বাতাস গায়ে লাগবে, বাতাস বইবে ঘরে, কাগজ উড়বে, উড়তে উড়তে এখানকার কাগজ সেখানে চলে যাবে, পেপারওয়েটের দরকার হবে। আর সবচেয়ে বিপদে পড়বে জর্জেটের ওড়না পরে আসা মেয়েরা। তাদের উড়ো চুল, এলমেল ওড়না দেখতে রফিক ভাইয়ের নাকি ভালোলাগে। এসব ভাবতে ভাবতে মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল আমার।  যদিও তা মিলিয়ে গেল সহসাই।

কারণ রফিক ভাই গল্পটা নাকচ করে দিলেন। ওনার পছন্দ হয় নাই। পছন্দ হবে না এমন একটা ধারণা আমার আগে থেকেই ছিল। টাকাটা খুব দরকার ছিল বলে নেগেটিভ রেজাল্ট আসবে জানার পরও ওনার কাছে এসেছি। মানুষের আশা খুব বেহায়া কোনো প্রাণীর মতো–এ কথাটাই মনে পড়ল। তাকে কনভিন্স করার সর্বোচ্চ চেষ্টাও বিফলে গেল আমার। আমি গল্প তার হাতে দেওয়ার আগেই নিজের করুণ পরিস্থিতির বিবরণ দিয়েছিলাম। রফিক ভাই এসবে গলে যাওয়ার লোক না। তার পত্রিকা এবং বাইরের জগত সম্পূর্ণ ভিন্ন। পত্রিকায় যা যা ছাপা হবে তার তার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনের কথাবার্তা, সম্পর্কের মিল থাকতেও পারে নাও পারে। এসব তিনি পরোয়া করেন না। দুইকে এক করে ফেলেন না তিনি। বেশ রাশভারি মেজাজের মানুষ। আপনি আপনি করে বলেন বয়সে ছোটদেরও। চাইলে ধারও নেয়া যায় টাকা তার কাছ থেকে। কিন্তু গল্প রিজেক্ট হওয়ার কারণে আমার আর তার কাছে ধার চাইতে ইচ্ছা হলো না। ইগোতে লাগল। আমি জানি ওনার কোন ধরনের গল্প পছন্দ। সেই মাফিক গল্প লিখে এর আগে নিয়ে আসলে সেগুলো ছেপেছেন, অথচ আজকেরটা ছাপতে রাজি হলেন না। আমার আজকেরটাই বেশি দরকার ছিল ছাপানোর। যাই হোক কী আর করা। ওনার সঙ্গে বসে বসে লাল চা খেলাম। আমাকে গল্প বিষয়ে জ্ঞান দিলেন। আগে কী কী গল্প লিখেছিলাম সেগুলো নিয় আবার কথা বললেন। আমার মনে হলো, বয়সে বড় লোকদের একটা সমস্যা আছে–একই বিষয়ে নিয়ে বারাবার তারা কথা বলেন। আমার গল্প নিয়েও রফিক ভাই আগের গল্পই করতে লাগলেন।

: আপনার ওই গল্পটা ভালো ছিল। ওই যে পাহাড়ের ঘুরতে গেল তিন বন্ধু। এরপর তারা গভীর কোন পাহাড়ে উঠে গেল, চু খেল, নিজেদের মনের কথা একজন আরেকজনকে খুলে বলতে লাগল। পাহাড়ে চাঁদের রাতের যে বর্ণনাটা আপনি দিয়েছিলেন না, একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি। আর গল্পটা যে শেষে এমন হবে আমি ভাবতেও পারি নাই। তারপর আপনার ওই গল্পটা, কোন গ্রামের ঘটনা যেন লিখেছিলেন, বলেছিলেন আপনি নিজেই ঘটনাটা দেখেছেন। কী যেন এক ভিখারী বৃদ্ধা, তার অলৌকিক ক্ষমতা একদিন জানাজানি হয়ে যায়। আপনি এসব গল্পে ভালো করবেন। তবে আজকের লেখা গল্প নিয়ে রফিক ভাই কিছু বললেন না। আমিও জানতে চাইছি না। জানলে তিনি হয়তো বিব্রত হবেন। ওনার রিজেকশনের কারণ সহজে অনুমেয়। যাকে নিয়ে গল্পটা লেখা, সেই মেয়েটা ওনার পরিচিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। যে কারণে গল্পে ওই মেয়ের নাম আমি পাল্টে দিয়েছি। তবে পরিবেশ, পরিস্থিতি, ঘটনা রফিক ভাইয়ের জন্য এতটা কমন যে, তিনি চিনে ফেলতে পারেন। ওই মেয়েকে আমার সঙ্গে তিনি দেখেছেন। লামিয়াকে রফিক ভাই না চেনার কথা না। এইটুকু শাহবাগ মোড়, সেখান থেকে কাঁটাবন তিন মিনিটে যাওয়া-আসার ব্যাপার। লামিয়াও কাঁটাবনে আসে আবার রফিক ভাইও শাহবাগে যান। অন্তত লামিয়া তো রফিক ভাইকে চিনবেই। না চিনলেও গল্পটা ছাপা হওয়ার পর জানাজানি হলে রফিক ভাইকে খুঁজে বের করতে ওর ওই তিন মিনিটই লাগবে–যে কারণে রিস্ক না নিয়ে লামিয়াকে আমি লাবণী করে দিয়েছি। কিছুটা লামিয়াও থাকল, আবার লাবণীও হলো–গল্পটা এ কৌশলে আমি গছিয়ে দিতে চেয়েছি।

কিন্তু লাবণী কে, গল্প পড়ে রফিক ভাই আমার কাছে এমন কিছু জানতে চাইলেন না। ওনার মুখের এক্সপ্রেশনেও ধরা পড়ল না কিছু। গল্পটায় এ সমস্যা আছে, এটা পছন্দ হয় নাই–এসব বলে আমাকে কিছু চেঞ্জ করে দেওয়ার কথা বলতে পারতেন তিনি। কিছুই যখন বললেন না, তার মানে গল্পটা ওনার খুবই অপছন্দ হয়েছে। সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে গল্প ছাপতে হয়তো ওনার আপত্তি আছে। হয়তো তিনি এসব মারপ্যাঁচে নিজেকে জড়াতে চান না। কী জানি! বিষয়টা আমি পরে বুঝে নেব, কাউকে জিজ্ঞেস করব ভেবে চুপ ছিলাম। আমার গল্প কেউ তেমন ছাপে না। ফেইসবুকে লেখা যায়, অনলাইনে বলে কয়ে দু’এক জায়গায় গল্প পাবলিশ করা যায়, তবে একটা প্রেস্টিজিয়াস পত্রিকায় ছাপা হওয়ার গুরুত্বটা তো ভিন্ন। রফিক ভাই আবার পুরস্কারও দেন। আমিও কোনোদিন সেই পুরস্কার পাব, এমন একটা গুপ্তবাসনা মনের মধ্যে নাই তা বলতে পারব না। এখন তার সঙ্গে তর্ক করে, মন খারাপ ভাব দেখিয়ে সেই সম্ভাবনার কুঁড়িটুকুও নষ্ট করে দেব–তেমন লোক আমি না। আমি যথেষ্ট মানিয়ে চলতে পারার মতো লোক। সহজে রাগ প্রকাশ করি না। রফিক ভাইয়ের ওখান থেকে বের হয়ে এলাম। হাতে সেই প্রিন্ট করা গল্পটা। গল্প যদি বাতিল হয়ে যায় তখন সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা বলে মনে হয়। অন্যসব আবর্জনা তো পচে কিছু একটা তৈরি হয়। গল্প রিজেকট হয়ে গেলে তার সেই সম্ভাবনাও থাকে না। আবার ফেলেও দেওয়া যায় না। বাদামি পাতলা খামে ভরা গল্পটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। কোনদিকে যাব ভাবছিলাম। প্রথমে একবার আজিজ হয়ে তারপর শাহবাগ–সবসময় এটাই করি। আজ আর এসব দিকে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নাই। গেলে যদি লামিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এই ভয়ে। লামিয়া আমার প্রায় প্রেমিকা। কাল রাতে যা হয়ে গেছে এরপর আর প্রেমিকা না বলার কোনো কারণ নাই। শুধু স্বীকারোক্তির অপেক্ষায় প্রেম বসে থাকে না। আমাদের সম্পর্কটা প্রেমেরই। আর কাল রাতে লামিয়া আমার ঘরে ছিল, একই বিছানায় শুয়েছে, আমরা সেক্স করেছি, ফলে প্রেম হয়ে গেছে–সমস্ত যুক্তি-বুদ্ধির বিচারে এ সিদ্ধান্তে আসাই যায়। অথচ আমার মন আর সায় দিচ্ছে না। নিজেকে লম্পট, সুবিধাবাদী–অনেক কিছু অনেক দিক থেকে আমি ভেবে দেখেছি। নিজের সঙ্গে নিজের বুঝাপড়া হয়েছে আমার সারারাত, আজ সকাল এবং এখন পর্যন্ত। আমি কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারি নাই। যত দূরে ছিল লামিয়া তত প্রেম ছিল তার প্রতি আমার। গতকাল রাতের পর এ কথাটা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেমন যেন কাছে আসার পর লামিয়ার প্রতি আমার প্রেম দূরে সরে যাচ্ছে। কেন ঘটছে এটা বুঝতে পারছি না। গল্পটাও এ নিয়ে। নিজে নিজে কী একটা সমাধান বের করতে লামিয়া ভোরে চলে যাওয়ার পর একটানে গল্পটা লিখে শেষ করেছি। গল্পটাও তাই লামিয়াকে নিয়ে।

গল্পে যা লিখেছি তাতে ফিরে আসি, তো সেই লেখকের মৃত্যুর পর তুমুল হৈ চৈ শুরু হলো শাহবাগে। আমি ফেইসবুকে থেকে সমর্থন জানাতে থাকলাম তাদের। লামিয়ার অফিসটা বোধহয় তারই দলের কারো। কারণ সে যখন-তখন মিছিলে চলে আসতে পারত। আমার কাজের চাপ থাকায় পারছিলাম না। এর মধ্যে তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বসল। আমিও তাল মেলালাম।

ওর সঙ্গে আমার শাহবাগেই পরিচয়। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের একটা কর্মসূচি। আমি সবে পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। একটা ব্যাংকে চাকরি করতাম তখন। এখন একটা গবেষণা ফার্মে ঢুকেছি। লামিয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। পরে সে এখন একটা এনজিওতে চাকরি করেছে। চাকরির শুরুর দিকে আমি শাহবাগ যেতাম শুক্র-শনিবার দেখে। আড্ডা দিতাম বন্ধুদের সঙ্গে। আজিজে যেতাম। এমনই একটা দিনে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন নিয়ে কী যেন একটা কর্মসূচি ছিল। একটা নাটকের মতো কর্মসূচি। অনেক লাইট ছিল আর আশপাশে অন্ধকার। গোল হয়ে সেই পারফরম্যান্স দেখছিল সবাই। এর মধ্যেই একটা ছেলেকে দেখলাম লামিয়ার পেছনে হাত দিতে। এক-দুবার এমন করার পর আমি ধমক দিলাম। আশপাশে ওই ছেলের সঙ্গে আরো কেউ কেউ ছিল। আমাকে পাল্টা ধমক দিতে তারা এক জোট হচ্ছিল। উচ্চ শব্দের কারণে কেউ ব্যাপারটা দেখতে বা শুনতে পারছিল না। সবার মনযোগ বনের বাঘ, হরিণ সেজে থাকা পারফরমারদের দিকে। লামিয়া ব্যাপারটা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল। সেও রুখে দাঁড়াল। ছেলেগুলো পরিস্থিতি দেখে পালাল। এরপর থেকে লামিয়ার সঙ্গে আমার সখ্য। শাহবাগে ওই রাতে সে আরো অনেকটা সময় আমার সঙ্গে ছিল। এরপর এক দিন আমি শাহবাগে আসলে ওই ছেলেগুলো আমাকে ঘিরে ধরল। আমার সঙ্গে বন্ধুরা থাকায় সে যাত্রা কিছু হলো না। বিষয়টা মিটমাটই হয়ে গেল বলতে হয়। আমি ইউনির্ভাসিটির দুই জুনিয়র ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিলাম। তারা আমার বর্ম হয়ে কাজ করল এরপর। সেদিন আবার লামিয়ার সঙ্গে দেখা। তারপর থেকে শাহবাগে আমরা নিয়মিত দেখা করতে থাকলাম। ফাঁকে ফাঁকে সুন্দরবন রক্ষা, এটা-সেটা নানা অনুষ্ঠানেও আমি হাজির হতে থাকলাম লামিয়ার কথায়। সে নিয়মিত দেশ ও সম্পদ রক্ষার প্রোগ্রামে আসত আর আমাকে থাকতে বলত। আমিও তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে তাদের একজন হয়ে উঠলাম। অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। ফেইসবুকে আমি তাদের পক্ষে কিছু কিছু লিখতে থাকলাম। তাদের অনুষ্ঠানের ছবি দিতে থাকলাম। আমার সারাউন্ডিংস চেঞ্জ হয়ে গেল দিনে দিনে। তবে আমি বুঝলাম, ওরা সবাই একটা ব্যানারে অনুষ্ঠান করলেও আলাদা আলাদা অনেক গ্রুপ তাদের। আমি লামিয়াদের গ্রুপের। একই অনুষ্ঠানে থাকা অন্যরা আমাকে কয়েকদিন পর পর এসে জানতে চাইত আমি কার সঙ্গে এসেছি। তখন আমি লামিয়ার নাম বলতাম। এতে তারা বুঝে যেত আমি লামিয়াদের গ্রুপের। আর কিছু বলত না। আমার সঙ্গে লামিয়ার সম্পর্ক কী তা অবশ্য কেউ কখনো জিজ্ঞাস করে নাই। তা তারা জানতে না চাইলেও নিশ্চয় তারা আমাদের একটা প্রেমের সম্পর্ক চলছে বল অনুমান করে নিয়েছে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে আসা, আবার অনুষ্ঠান শেষে এক সঙ্গেই বের হয়ে যাওয়া— দিনের পর দিন এসব চললে আশপাশের মানুষ প্রেম করছ বলেই ধরে নেবে। আমি বা লামিয়া এসব নিয়ে কখনো নিজেদের মধ্যে কথা বলি নাই। আমরা একজন আরেকজনকে তুমি বলতাম। দুপুরে একসঙ্গে খাওয়া, রিকশায় ঘুরে বেড়ানো, বসন্ত-বৈশাখ, পহেলা মে, নারী দিবস, বৃষ্টি–যা কিছু ঘটছে আমরা একসঙ্গে করছি। প্রথম প্রথম কোনো নতুন কাউকে রিক্রুট করার জন্য লামিয়াদের গ্রুপে এটা স্বাভাবিক। তবে দিন যদি পার হয়ে যায় আর তারা দু’জন যদি ছেলেমেয়ে হয় তাহলে সেই সম্পর্ক অবশ্যই প্রেম। অথচ না লামিয়া, না আমি কেউ কখনো প্রেম করছি এরকম মুখে কখনো বলি নাই। এ বিষয়ে কোনো কথাও হয় নাই আমাদের মধ্যে। বিশেষ করে লামিয়া তো ইস্যু ছাড়া কথাই বলে না। আমি যে কোন পাল্লায় পড়লাম তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আবার ছাড়তেও পারছিলাম না। যত যাই হোক নারীসঙ্গ কে ছেড়ে আসে? আর তাদের দাবি-দাওয়াগুলোকেও উপেক্ষা করার কিছু নাই। সুন্দরবনের মতো এমন প্রাণ-বৈচিত্র্যে ভরপুর একটা জায়গার পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এটা কেমন কথা! আমি এমনিতেই উন্নতি পছন্দ করতে পারি না। নিজের উন্নতি মেনে নিলেও অন্যের উন্নতি আমার সহ্যই হয় না। এরপর আরো তো কত ইস্যু আছে।

ফেইসুকেও আমার লাইক, শেয়ার বেড়ে যেতে থাকল। হু হু করে বন্ধু সংখ্যা বাড়ল। অফিসে আমাকে একজন প্রগতিশীল অ্যাক্টিভিস্ক বলে মূল্যায়ন করা হতে থাকল। বস বেশ খুশি আমার কালচারাল অরিয়েন্টেশনে। আমি আর কী করব, তখন? ভাবলাম বেশ ভালোই তো! ইস্যুরও অভাব ছিল না। একটার পর একটা লেগেই আছে। আজ এ ধর্ষণের শিকার, কাল ওখানে খুন হচ্ছে, আগুন লাগছে, শ্রমিক মরছে। মোটামুটি একই লাইনে কথা বলতে হয়। সরকারের সমালোচনার সঙ্গে বিত্তবান, কোটিপতি, কারখানা মালিক তাদের বিরুদ্ধে বলতে হয়; আর তাদের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশ দেখাতে হয়। এর বাইরে কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান দেখাতে পারলে আমি যাকে বলে হিট। আর শাহবাগ গিয়ে দু-একটা বিক্ষোভ সমাবেশে কথা বলে রাত ঘন হওয়ার আগেই বাসায় চলে আসা যায়। লামিয়া কখনো যায় নাই আমার বাসায় আগে। গতকাল রাতেই প্রথম। বাসা ফাঁকা থাকলে আমার রুমমেটরা তাদের বন্ধাবীদের নিয়ে আসে। এসব কথা আড়েঠারে আমি লামিয়াকে বলতাম। সে শুনে মুচকি হাসত। বলত, ‘কী, খুব ইচ্ছা না?’

‘কীসের ইচ্ছা?’

লামিয়া বলে, ‘ভাজা মাছ উল্টে খাওয়ার ইচ্ছা। বেড়াল হয়ে গেছো তাই না?’

আমি লাজুক ছেলে, চুপ করে যেতাম। লামিয়াকে দেখতাম। পুরোনো কোনো গাছের মতো ওর শরীর। কোথাও বাঁক, কোথাও একটু গভীরতা, হঠাৎ ওর চাহনিতে হতবিহ্বল আমি। মাঝে মাঝে খুব কাছে এসে দাঁড়াত লামিয়া, বুকে ঘষে দিত আমার বাজুতে। খুব তেঁতে উঠতাম তখন। কিন্তু ওর সঙ্গে এটুকুই। লোভ আমার হতো না তা না, লামিয়ারও তো হতো নিশ্চয়। আর সে-ই তো স্বেচ্ছা সিদ্ধান্তে আমার বাসায় গেল।

আমি ব্যাচেলর কোয়ার্টারে থাকি। আমাদের বাসায় মেয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। মালিক এতে কিছু বলেন না। বাসার দারোয়ানের অনুপুঙ্খ নজরদারির বেড়া অবশ্য মেয়েদের পার হতে হয়। আমার রুমমেটের বান্ধবীরা তাকেও হাত করে ফেলেছে। লামিয়াকে বাসায় নিয়ে যাওয়াটা আমার জন্য এ দিক থেকে টেনশনের ছিল না। টেনশনটা ছিল নিজের। এটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল। লামিয়ার কী ছিল জানি না। বুঝতেও পারি নাই। আর এই প্রথম মিলনের পর থেকেই কেন যেন তাল কাটতে শুরু করল আমার।

যদি আমি সাচ্চা মানুষ হিসাবে বলি, তাহলে ঘটনাটা হলো আমাকে ঢাকা ছাড়তে হবে। নাটোর চলে যতে হবে দীর্ঘদিনের জন্য। সেখানে একটা গবেষণা হবে ওয়েদার নিয়ে। আমাদের হাউস নতুন প্রজেক্ট পেয়েছে। শাহবাগে ঘোরাঘুরির পর থেকে কেন জানি না বস আমাকে পছন্দ করে ফেলেছেন। যে কারণে নতুন প্রজেক্টে আমাকে দায়িত্ব দিচ্ছেন। আমিও ঢাকা ছাড়তে চাইছিলাম। কিন্তু লামিয়াকে ছাড়ব বলে মনে হয় নাই। নাটোর আমার বাড়ি। সেখানে ছোটভাই, মা, বড় বোন থাকে। বোনের বিয়ে হয়ে গেলেও সেটা পাশের বাড়িতে। একই পরিবার আমাদের। বাবা নাই। ফলে আমিই কর্তা। যে কারণে নাটোর গিয়ে পরিবারের সঙ্গে আবার কয়েক বছর থাকার লোভ আমার আছে। আবার কোন এলাকায় পোস্টিং হয় কে জানে। নাটোরে আমার থাকা-খাওয়ার খরচ বাঁচবে। যা বেতন পাই, বাড়িতে পাঠানোর পর আমার পক্ষে চলতে কষ্টই হয়। মানে ঠিক স্বচ্ছলতা আসে না। আমি দেখা গেল অনেক হিসাব করে চলছি। তো নাটোর গেলে লামিয়াকে হারাতে হবে এমন তো না। সে থাকবে বা থাকবে না–মানে আমাদের কোনো কমিটমেন্ট নাই। আমি যদি মনে করি তাকে বিয়ে করব, করতে পারব। মা বা বোন এ বিষয়ে কিছু বলবে না আমাকে। আমি লামিয়াকে প্রথমে ভেবেছিলাম বলব না নাটোর যাওয়ার কথা। চেপে যাব। ভাবছিলাম যে, যাওয়ার আগে আগে বলব, নাকি একেবারেই বলব না, পুরোটাই লুকিয় রাখব; আগে বললে যদি ঝুলে যেতে চায়! ফেইসবুক বন্ধ করে বসে থাকব? লামিয়া যোগাযোগ করলে ধমক দেব। লামিয়া নিশ্চয় আমাকে জ্বালাবে না। আর সব পুরুষের মতো ভাববে। লম্পট, প্রতারক, নারীশরীরলোভী। আরো অনেক কিছু ভাবতে পারত সে আমাকে। এসব চিন্তায় কুলিয়ে উঠতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিলাম, তাকে বলি, কী হয় দেখি! আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে সে মেনে নিল সহজে। খুশি হলো। ঢাকা ছাড়তে পারছি আমি, এতে সেও খুশি। মাঝে মাঝে যাবে সে। ঘুরে বেড়াবে নাটোর। জীবনানন্দ দাশের কবিতার নাটোর, আহা! এসব অনেক কথা বলল। আমার জন্য ওর দিক থেকে কোনো চাপ এবারও সে দিল না। আমি ভাবলাম, তাহলে তো ভালোই। আমার কোনো টেনশন নাই। লামিয়া বিষয়ে ভাবার সুযোগ আছে আরো। নাটোর গিয়ে ভেবে দেখি কী করব। গল্পে অবশ্য এ বিষয়টা লেখি নাই আর। নিজেকে আমি সেখানে একেবারেই আলাভোলা একটা ছেলে হিসাবে রেখেছি। আমি আমি করে গল্পটা বলেছি। নাটোর যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে শুয়ে লামিয়া আমাকে প্রেমই নিবেদন করেছে বলে মনে হচ্ছে। গল্পে এ কথাটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বুঝঅতে চেয়েছি।

গল্পটা শুরু করেছি গতকালের ঘটনাটা দিয়ে। গল্পটায় একটা ঘটনা আছে। সেটা হলো হেফাজতে মৃত্যু হলো এক লেখকের। এই লেখককে আমি চিনতামই না। লামিয়া চিনত বলেও আমার মনে হয় না। একদিন গভীর রাতে জানা গেল তিনি হেফাজতে মারা গেছেন। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল কেউ বলে, আবার এর অথেনটিক সোর্সও নাই। তবে এ লেখক কুমির চাষী বলে পরিচিত। এ নিয়ে তার একটা বই আছে। সেখানে কিছু ব্যবসয়ীর কথা বলা আছে। তিনি আরেকজন কার্টুনিস্টসহ অ্যারেস্ট হন এবং পরে মারা যান। এখন আমি যে হিসাবটা বুঝেছি সেটা হলো, এ ইস্যুটা গরম হবে। কোন ইস্যু মাঠ গরম করবে, কোন ইস্যু করবে না তা মোটামুটি আগে থেকেই বুঝা যায়। লামিয়ারা চাইলে কিছু কিছু ব্যাপারকে বড় ইস্যু করে ফেলতে পারে। এটা অবশ্য ঘটনার ওপর ডিপেন্ড করে। যেমন এমন কেউ যদি মারা যায় যে লামিয়াদের টেস্টের না, তাদের সঙ্গে যায় না, লেখক বা ব্লগার এসব না–তখন তারা খুব একটা নাড়াচাড়া দেয় না। আর শুক্রবার ছাড়াও আমি দেখেছি যে ওদের অনেকের অফিস, চাকরি থাকে। ফলে শুক্রবার বেশ ভালো মিছিল-সমাবেশ হয়। এর আগে ধর্ষণের ঘটনায় তারা এরকম শাহবাগ জমিয়ে ফেলেছিল। সে কি আগুন গরম বক্তৃতা! শুনতে শুনতে আমার রোম খাড়া হয়ে যায়। সেই উত্তাপ বাসায় গিয়েও যায় না। অফিসেও বেশ একটা ভাব চলে আসে আমার মধ্যে। আরো গম্ভীর, আরো গূঢ় কোনো কথা যেন বুকে নিয়ে আমি চুপ হয়ে থাকি। নাভীর ভেতর থেকে কথা বলি তখন। বসের সেটা পছন্দ হয়। আমিও এনজয় করি।

তো ধর্ষণের সেই আন্দোলনের পর একবার দোয়েল চত্বরে আমাকে ধরেছিল ছাত্রলীগের কিছু ছেলেপিলে। তারা আমার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড চেয়েছিল। ভাগ্যিস লামিয়া কেন যেন তখন ওইদিক দিয়েই তোপখানা রোড যাচ্ছিল। ওকে পেয়ে আমার ইজ্জত বাঁচল। ঘটানাটা আমি বাসায় ফিরে লিখলামও ফেইসবুকে। সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল। প্রগতিশীল মহলে আমার পরিচয় বেড়ে গেল আরো। এমনিতে আমি একটু স্বাস্থ্যবান শরীরের তিরিশ অতিক্রান্ত এক যুবক। মাথাভর্তি চুল, গোলগাল মুখ। পাঞ্জাবি পরে শাহবাগে যাই। নিজের ভেতর একটা ফুরফুরে ভাব চলে আসতে থাকল আমার ভেতর এসব কারণে।

ওই ঘটনার পর লামিয়া আমার প্রতি আরো দায়িত্বশীল হতে থাকে। শাহবাগে আমার যাওয়া ও আসা নিশ্চিত করতে থাকে। আমি বুঝে যাই যে এটা লামিয়াদের টেরিটরি। ছাত্রলীগের সঙ্গে তাদের এ সহাবস্থান। কখনো কখনো দু’পক্ষে মারামারি হয়ে যায়। আমি মারামারি ভয় পাই। লামিয়ার ছত্রচ্ছায়ায় আমি ঘুরে বেড়াতে থাকি। ছবির হাটে আড্ডা দিই। আমার পকেটে টাকা থাকে বলে শর্মা হাউজ, বিএফসি, সিএফসি, স্টার–এসবে রাতের খাবারটা খেয়ে নিতাম। বেশি টাকা অবশ্য আমি খরচ করতে চাইতাম না। লামিয়া খুব বুঝের মেয়ে, সে টের পেত।

গল্পে যা লিখেছি তাতে ফিরে আসি, তো সেই লেখকের মৃত্যুর পর তুমুল হৈ চৈ শুরু হলো শাহবাগে। আমি ফেইসবুকে থেকে সমর্থন জানাতে থাকলাম তাদের। লামিয়ার অফিসটা বোধহয় তারই দলের কারো। কারণ সে যখন-তখন মিছিলে চলে আসতে পারত। আমার কাজের চাপ থাকায় পারছিলাম না। এর মধ্যে তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বসল। আমিও তাল মেলালাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই পোস্ট ডিলিট করে দিলাম বসের কারণে। বস পোস্ট দেওয়ার দু’ মিনিটের মাথায় ডেকে পাঠালেন আমাকে।

বললেন শোনেন, ‘বিপ্লব যতদিন ছাতার নিচে আছে, ততদিন সেটা আপনার আর আমার জন্য। যান পোস্টটা ডিলিট করে দেন’।

আমি নগদে ডিলিট করে দিলাম। মন খারাপ হলো খুব। কাজে আর মনসংযোগ রাখতে পারছিলাম না। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। পরদিন শুক্রবার বিশাল মিছিলের আয়োজন শাহবাগে। লামিয়া আমাকে মেসেজ দিয়ে করেছে, কল দিয়েছে, রাতে অন্তত একবার শাহবাগ যেতে বলেছে। কিন্তু আমি পড়ে গেছি মহা দুশ্চিন্তায়। আমার চাকরি আবার আমার নৈতিকতা নিয়ে ব্যাপক এক টানাপড়েন। এ অবস্থায় শাহবাগ গিয়ে বাড়তি বিপদ হয় কিনা। এসব ভেবে লামিয়াকে শুক্রবার শাহবাগে যাব জানিয়ে আর যোগাযোগ করলাম না।

তারপর শুক্রবারও গড়িমসি করছিলাম যেতে। লামিয়া বারবার বারাবর ফোন দিচ্ছিল। আমি গেলাম একেবারে শেষে। তখন অনেকে চলে গেছে। লামিয়া দেখলাম একা বসে আছে শাহবাগ থানা উল্টা পাশের আইল্যান্ডে। ক্লান্ত সে ঘামছে। আমি তার কাছে গেলাম। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। বুঝার চেষ্টা করছিল হয়তো কিছু। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো সঙ্গে সঙ্গে। হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল আজিজ মার্কেটের সামনে। হন হন করে হাঁটতে থাকল। আমি তার পিছু পিছু। আজিজ মার্কেটে গিয়ে আমরা জ্যুস খেলাম। লামিয়া সরাসরি জানতে চাইল কী হয়েছে।

আমি ঘটনাটা লুকালাম না। অফিসের বসের কথাটা বললাম। লামিয়া শুনে চুপ থাকল। একমনে জ্যুস খেল। ওর শরীর থেকে ঝাঁঝাল ঘামের গন্ধ আসছিল নাকে আমার। লামিয়া চোখে কাজল দেয়। চোখ বড় বড় করে সে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর জ্যুস খাচ্ছে। খাওয়া শেষে আড়মোড়া ভাঙল। উফ করে উঠে আবার আমার দিকে ঝুঁকল। বলল চলো রিকশায় ঘুরি।

তা রিকশায় ঘোরা খুব একটা বাজে বিষয় ঢাকার অন্তত এ জায়গায়। তারপরও আমরা কাঁটাবন হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম, ফুলার রোড হয়ে শহীদ মিনার হয়ে পলাশী চক্কর দিলাম। আবার ঘুরলাম। লামিয়া আমার বাজু ধরে থাকল পুরোটা রাস্তা। কোনো কথা হলো না আমাদের। ওর বুকের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছিল আমার শরীরে। এরপর আমরা খেলাম। তারপর বাসায়।

এরপর গতকাল রাতে কোনো নারী শরীরের স্পর্শ পেলাম। খুব ধীরলয়ের সঙ্গম হলো আমাদের। কোনো এক গভীর থেকে শুধু নিঃশ্বাসের পতন হচ্ছিল, ঘন, ঘন। তা আরো বাড়তে থাকল। আমার চোখ বুজে এসেছিল, লামিয়ারও। তারপর আমরা অনেক কথা বললাম নিজেদের নিয়ে। আমাদের পরিবার, আমাদের রুচি, ভালো-মন্দ। লামিয়ার বিষয়ে জানলাম। ঢাকায় তার কেউ নেই বলতে গেলে। তার রাজনীতি পছন্দ করে না কেউ। গ্রামের বাড়ি ভোলা। সে একাই অনেক কষ্টে টিকে আছে ঢাকা শহরে। কোনো ছেলেকে তার ভালোলাগে নাই আমার মতো করে–আরো অনেক কথা। ওর সংগঠনই ওর পরিবার। ওদের সঙ্গেই তার জীবনযাপন। আমি ব্যতিক্রম তার সেই জীবনের। এটুকুই নাকি তার জানালা। কথা বলতে বলতে রাত যেন ফুরায় না আমাদের। নগ্ন-নির্জন আমি আর লামিয়া। আমাদের কথা ছড়িয়ে পড়ে শরীরে শরীরে। আমরা একে অপরকে লেপ্টে থাকি, ঘেঁষে থাকি দুজনে। গন্ধ শুঁকি। তারপর আবার হয় আমাদের মধ্যে। আমি তারপরও আনাড়ি। লামিয়ার শেখানো পথে চলতে থাকি। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে সে। আমাকে আঁচড়াতে থাকে। গলার স্বর ভারি হয়ে ওঠে তার। কী যেন খোঁজে সে আমার মধ্যে। মাথার চুল খামচে ধরে। নাক ডুবিয়ে দেয় সেখানে। পিঠে হাত বোলায় আমার। আরো ভেতরে যেতে বলে আমাকে। আমি বুঝতে পারি না আর কত ভেতর আছে তার। কীভাবে যায় সেই ভেতরে! ভয় পেয়ে বসে আমাকে। সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ধরে আমাকে লামিয়া। আমি ঘামতে থাকি। যাকে ভয় পাচ্ছি তাকে জড়িয়েই আবার ভয় তাড়াতে চাইছি। লামিয়ার আদর, তার ভেতরে আমার গমনাগমন–যেন কোনো কুজ্ঝটিকা পার হচ্ছি। বের হতে চাইছি সেখান থেকে। কিন্তু পারছি না। লামিয়া দিচ্ছে না আমাকে বের হতে।

সেই রাতে তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়ি জানি না। লামিয়া ভোরে উঠে চলে যায়। আমার দিকে তাকায় না। আমিও চেষ্টা করি না তাকাতে। ‘এই আমি যাব’ এটুকু শুধু বলে লামিয়া। আমি কোনো কথা বলি না। বিবমিষা আমাকে গ্রাস করেছে। যেন আমি পরম আগ্রহে কোনো বিষ্ঠায় পা দিয়েছি। কেন এমনটা মনে হয় তারপর থেকে এ পর্যন্ত আমি ভেবেছি। কোনো কারণ নাই। তবু ফিরে ফিরে আসছে এ অনুভূতি। অভিজ্ঞ বন্ধুরা আমাকে বলেছিল, ‘প্রথমবার এরকম হয়। পরে আবার করতে থাকলে ঠিক হয় যায়’। আমার সমস্যাটাও কি ওদের মতো না অন্যকিছু?

পরে আবার লামিয়ার সঙ্গে পারব আমি? সর্বাঙ্গে ক্লান্তি নিয়ে লামিয়াকে নিচে নেমে গেট খুলে দিলাম। তখন ভোর হলো কেবল। লামিয়া ঠিক চলে যেতে পারবে আমি জানতাম। ও চলে গেলে আমি রুমে ফিরে আসি। ঘুমও আসছিল না। তারপর গল্পটা লিখতে শুরু করি। লেখক যখন লিখতে বসে, তখন নাকি সে নিজেকে খুঁজে পায়। আমিও খুঁজে পাব ভাবলাম। কতটা পেলাম জানি না। গল্পটাও নিলেন না রফিক ভাই। খুব হতাশ লাগছে। নাটোর যাওয়াটা বাঁচিয়ে দেবে আমাকে। কিন্তু সেটা মাসখানেক দেরি। এই দিনগুলো কীভাবে কাটাব? আবার শাহবাগ যাব? লামিয়ার সঙ্গে দেখা করব, ঘুরব। কিছুতে মানতে পারছি না কেন যেন এসব।

পালিয়েই বা কত থাকব। লামিয়া আমার সব চেনে, বাসা থেকে অফিস সব। ফোন নাম্বারটা না হয় চেঞ্জ করলাম। বাকিসব? জানি না। এলিফ্যান্ট রোডের দিকে হাঁটতে থাকলাম। এর মধ্যে লামিয়ার ফোন আসল। আমি ধরলাম না। মাথাটা ফাঁপা লাগছে। গতরাতের ওর ফোঁস ফোঁস মাথায় ঘুরছে। হাঁটতে হাঁটতে ধানমন্ডি লেক পর্যন্ত যাওয়া যায়। আগে আমি হাঁটতাম এ পথে, একা একা। লামিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে। ওর সঙ্গে পরিচয়ের পরে আর একা থাকা হতো না আমার। নির্জনতা পছন্দ করি আমি। লামিয়ার উছিলায় ক্যাওয়াসের মধ্যে পড়ে যাই। অনেকদিন পর আবার একা হতে পারলাম। অনেক মানুষের ভিড়ে একা আর নির্জন থাকাটা আমার পছন্দের। লামিয়ার সঙ্গে শাহবাগে গেলে গলা মেলাতে হয়, গলা চড়াতে হয়, নিজেকে অ্যাকটিভ রাখতে হয়। সারাক্ষণ ঘটনা, ব্যক্তিকে সার্বিকভাবে ব্যাখ্যার প্রয়োজনিয়তার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম এতদিন। একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়াবলির দিক থেকে নজর সরে গিয়েছিল।

এগুলো বলেছি গতকাল লামিয়াকে। গল্পেও এসব লিখেছি। আর সেক্সের বিবরণ দিয়েছি। হয়তো সেটাও রফিক ভাইয়ের পছন্দ হয় নাই। হাতের ভেতর সেই গল্পটা ঘামছে। আমিও ঘামছি। গতকাল যেমন ঘামছিলাম লামিয়াকে ভাঙতে ভাঙতে। ওর কাছে হার না মানার, নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য এক উদ্যমী যুবকের মতো কতটা বেপরোয়া হয়ে পড়েছিলাম আমি! নিজেকে কখনো আমি লামিয়ার কাছে হারতে দিতে চাই নাই, কিন্তু কেন?

. . . 

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সমালোচক।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি