সাম্প্রতিক

একটি আসমাপ্ত চিঠি । নাহিদা আশরাফী

কি রে বুবাই, চুপ হয়ে গেলি কেন? বেশ তো আনন্দে ছিলি। ক্লান্ত হয়ে গেলি? আমিও খুব ক্লান্ত রে। তবু তোকে লিখে যেতে চাই। চিঠিটা শেষ করতে হবে আমি ফুরিয়ে যাবার আগেই। আচ্ছা বলতে পারিস আমিই কি ভুল পথে চলি না ভুলগুলো সব আমারই সামনে এসে শেষ হয়? সবাই শুরুর বেলার গল্প শুনিয়ে শেষের বেলাভূমিতে এসে অপেক্ষার আঁচড় কাটে। আর আমি শেষের বেলায় দাঁড়িয়ে শুরুর স্বপ্ন বুনছি। এ যেন,”তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা। ” এই তো বুবাই আর একটু অপেক্ষা কর। একটু পরেই তুই পৃথিবীর আলো দেখবি আর আমি ওপারের আধার। জানিস চারদিকে ডাক্তার নার্সের ছুটোছুটি, অপারেশান থিয়েটারের হার্ট বিট বাড়িয়ে দেয়া যন্ত্রপাতি , সিলিং থেকে ঝুলে থাকা চোখ ঝলসে দেয়া আলো সেই সাথে মৃত্যুগন্ধ। কি ভীষণ ব্যস্ত সবাই আমাকে নিয়ে। এর মাঝেই আমি লিখে যাচ্ছি তোকে । আমার নির্বিকার আচরণ ওদের কিছুটা অবাক করছে হয়তো। কিন্তু ওরা তো বুঝছে না, গত ন’টি মাস যে স্বপ্নের বীজ আমি তিল তিল করে আমার ভেতরে বড় করে তুলেছি আর একটু পরেই সেই স্বপ্ন নীল সাদা পরীদের পাখায় ভর করে এই মাটির পৃথিবীতে পা রাখবে। তোর ছোট্ট তুলতুলে হাত—

পা ধরে দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো। বুকের মধ্যে চেপে ধরে তোর কপালে একটা চুমু এঁকে দেবার ইচ্ছেটা কী খুব বেশি চাওয়া , বল? সেটুকুও হল না।

শোন বুবাই, আমার শেষ ইচ্ছেটুকুর কথা বলে গিয়েছি মা কে। আমার থেকে সব বন্ধন ছিন্ন করে নিয়ে যাবার আগে একবার যেন তোকে শুইয়ে দেয়া হয় আমার বুকে। তুই কিন্তু একটি বার আমার মুখটা দেখে রাখিস। নইলে মা কে চিনতে না পারিস যদি! ওই দ্যাখ, আবোল তাবোল বকে তোকে আসল কথাটাই বলা হয়নি। আজ তোর ষোল বছর পূর্ন হলো। শুভ জন্মদিন আমার সুইট সিক্সটিন বুবাই। কাঠের আলমারিটা থেকে ষোলতম প্যাকেটটা নিশ্চই পেয়েছিস। পছন্দ হয়েছে তো ডায়রী টা? এতদিন শুধু খেলনা, জামা এসবই পেয়েছিস। এবার একটা ছোট্ট ডায়রীও সাথে পেয়েছিস নিশ্চয়ই।ডায়রীটা দেবার একটা ছোট্ট উদ্দেশ্য আছে। আজ থেকে তুই লিখবি তোর প্রতিদিনকার কথা। স্বপ্ন,ইচ্ছে,ভালোলাগা, মন্দলাগা—

যা আমায় তোর বলতে ইচ্ছে করে, সব। লিখে রোজ রাতে রেখে দিবি তোর মাথার কাছে। আমি চুপটি করে এসে কোন এক অবসরে পড়ে যাবো। যে ন’মাস তুই আমার সাথে ছিলি সেই সময়কার প্রতিমাসের গল্পগুলো আমি ন’টি চিঠিতে রেখে গেলাম। এখন থেকে প্রতি বছর এক একটি চিঠি পড়বি। তোর আগমন থেকে আমার প্রস্থান অবধি গল্প আমি তোকে জানিয়ে গেলাম। এবার তুই আমায় শোনাবি আমার প্রস্থান থেকে তোর বেড়ে ওঠার গল্প। জানিস এই মাত্র অপারেশন থিয়েটারের একজন নার্স এসে আমায় কী একটা ইনজেকশান দিয়ে গেল। মেয়েটা কাঁদছিলো আমার দিকে তাকিয়ে। আমার তো বেশ আনন্দই লাগছে। কেন যে সবাই আমায় ঘিরে এভাবে কাঁদছে? অন্য ভূবনে যাবার মুহূর্তে আমি সবার আনন্দিত মুখ দেখে যেতে চাই। তাছাড়া ঐ জগতে আমি তো আর একা নই। বাবা অপেক্ষায় আছে আমার জন্যে। শুধু মায়ের জন্যে কষ্ট হয় রে খুব। বেচারি সারাজীবন যুদ্ধ আর কষ্ট নিয়েই বাঁচলো। কিছুক্ষন আগে মা বোবা ভাষায় তাকিয়েছিলো আমার দিকে। আমি বুঝি তার অভিমান। মা কে ভোলাতে তাই হাসি মুখে বল্লাম,”ভেবেছো তোমায় ছেড়ে যাচ্ছি? মোটেই না। তোমার বুকের ওম খুব পেতে ইচ্ছে করে মা। তাই ছোট্ট তুলতুলে বুবাই হয়ে তোমার কোলেই ফিরে আসছি। খুব আদর করো আমার বুবাইকে।  ” তুই বড় হতে হতে মা যদি আমার কাছে চলে না আসে তবে তাকে খুব করে ভালোবাসিস রে।আমার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে গিয়ে আমি স্বার্থপরের মতো তাকেই সন্তানহারা করলাম যে। যেদিন প্রথম জানলাম আমার ভেতরে কন্যা,জায়া,জননী রুপী এক দেবশিশু বেড়ে উঠছে আনন্দে সারারাত আমি ছাদে বসে জোসনা মেখেছি। এক অপার্থিব আনন্দে আমি যখন দিশেহারা তখন কাছের মানুষগুলোই কত অবহেলায় বলেছে,”কন্যা সন্তানের জন্য নিজের জীবন শেষ করছো? ছেলে হলেও না হয় বংশের মুখ রক্ষা হতো।” —

জানিস বুবাই প্রথম যেদিন তোর অস্তিত্ব টের পেলাম , খুশিতে প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। এত আনন্দ… এত খুশি! খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো তখন।ইচ্ছে হচ্ছিলো এক ছুটে কিছুক্ষন হাত পা মেলে বৃষ্টিতে ভিজি। সামনের বকুল গাছটায় অকারনেই কয়েকটা ঝাকি দেই। গোলাপের কলিগুলো আজই সব ফুটিয়ে দেই। আকাশ থেকে তারাগুলো পেড়ে এনে তোর জন্যে একটা দোলনা সাজাই।

আমার মৃত্যু বা তোর আগমন এদের কাছে খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। ছেলে জন্ম দিতে গিয়ে মা মরলেও পূণ্য। আর মেয়ে জন্ম দেবার চেয়ে মায়ের বেঁচে থাকায় লাভ। পরবর্তীতে বংশের প্রদীপ জ্বলাবার চাঞ্চ থাকে। আসলে বদ্ধ ও চিরায়ত সমাজের সাবেকী দৃষ্টিভঙ্গির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হতে এরাও সত্যাসত্য ভুলে নিজেদের—

যাদেরকে এরা বংশের মুখ রক্ষাকারী মনে করছে সেই মুখটিকেও এই পৃথিবীতে আসতে একজন মেয়ে বা মায়েরই আশ্রয় নিতে হয়।

এদের ওপরে আমার কোন রাগ, ক্ষোভ বা অভিমান নেই রে। তুইও রাখিস না যেন। বাদ দেই এসব কথা।
তবে একটা কথা রে মা, পৃথিবীটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিটি পদে এখানে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সার্কাসে রোপ ওয়ের মতো। একটু ব্যালান্স ফসকেছিস তো শেষ। তাই বলে ভয় পাস না রে বুবাই। তুই কোন দায় নিয়ে এ পৃথিবীতে আসিসনি। প্রকৃতি তার প্রয়োজনেই তোকে এনেছে। অতএব তার সন্তানদের ব্যবস্থা সে করবেই। প্রয়োজন শুধু মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাওয়া। ভয় না পেয়ে ভয় কে জয় করা। কে পথ আগলে দাঁড়ালো, কে পেছন থেকে টেনে ধরলো, কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চাইলো কিচ্ছু দেখবি না। শুধু এগিয়ে যাবি।পারবি না? আর আমি তো সাথে রইলামই। 

উফ!!! আর যে কত জ্বালাবে এরা। কি একটা ইঞ্জেকশন পুশ করলো আমার হাতে। হাতটা এত জ্বলছে যে ঠিক মতো লিখতে পারছি না। মা রে আর বোধহয় বেশি সময় নেই। শেষ সময়টুকু ঘনিয়ে আসছে। বিশ্বাস কর আমার এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। শুধু তোর মুখটা দেখতে পাবো না। এটুকুই যা বেদনা। কয়েকটা জামা সেলাই করে রেখে গেলাম তোর জন্যে। উলের একটা সোয়েটার আর দুই জোড়া মোজা। এরপর অসুখটা এমন জাপটে ধরলো যে আর কিছু করে যেতে পারলাম না তোর জন্যে। একটা আধবোনা মাফলার তার পূর্নাঙ্গ রূপ পেলো না। শেষটায় চোখ এমন ঝাপসা আর হাত এমন জড়িয়ে আসতো যে…আধবোনা মাফলারটা অসমাপ্ত হয়ে রইলো আমার জীবনের মতোই। আলমারিটার উপরের তাকে দুটো শাড়ি রাখা আছে। একই রকম। খুব ইচ্ছে ছিলো তোর প্রথম শাড়ি পরার দিনে আমি আর তুই একই রকম শাড়ি পরবো। তা তো আর হলো না। তুই যেদিন প্রথম শাড়ি পরবি সেদিন অই শাড়িটা একটু ছুঁয়ে দিস।

জানিস বুবাই প্রথম যেদিন তোর অস্তিত্ব টের পেলাম , খুশিতে প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। এত আনন্দ… এত খুশি! খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো তখন। ইচ্ছে হচ্ছিলো এক ছুটে কিছুক্ষন হাত পা মেলে বৃষ্টিতে ভিজি। সামনের বকুল গাছটায় অকারনেই কয়েকটা ঝাকি দেই। গোলাপের কলিগুলো আজই সব ফুটিয়ে দেই।
আকাশ থেকে তারাগুলো পেড়ে এনে তোর জন্যে একটা দোলনা সাজাই। কি সব অদ্ভুত ইচ্ছেরা ঘুরপাক খেতে লাগলো মনের মধ্যে। কিন্তু মজা কি জানিস আনন্দগুলো বৃষ্টি বিন্দু হয়ে মনেই ঝড়লো।
এমন ছেলেমানুষি কি সবাইকে দেখিয়ে করা যায়, বল? তিন মাস কেমন করে কেটে গেল জানিনা। আমার সাথে সুখের বোধহয় আর জনমে কোন শত্রুতা ছিলো। নইলে এমন কেন হবে?

এর পরের সময়গুলো মনে করতে বা বলতে একেবারেই ইচ্ছে করে না। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া, ডাক্তার,নার্স,ডায়াগনস্টিক সেন্টার,এত এত টেস্ট, গাদা গাদা ঔষধ সব খুব শক্ত হাতেই সামলেছি জানিস? কিন্তু ডক্টরের ছোট্ট একটা কথা আমায় এক ঝটকায় শূন্য করে দিলো। তার অই কথার পর তাকেই আমার সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে হয়েছিলো। এক নির্মম শর্ত সে জুড়ে দিলো তোর আর আমার মাঝে। এ পৃথিবী আমাদের দুজনের ভার বইতে অক্ষম। যে কোন একজনকে তাই ছেড়ে দিতে হবে স্থান। এ কেমন নিষ্ঠুর খেলা! ঠিক যখন আমি তোর অস্তিত্ব কে উপলব্ধি করতে শুরু করেছি, তোর নিশ্বাস প্রশ্বাস গুনতে শুরু করেছি, তোকে নিয়ে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছি ঠিক তখনি দমকা হাওয়া এসে প্রদীপ নিভিয়ে দেবে—

এ আমি মানবো কেমন করে!!! সেই রাত থেকে আমি অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। একটা ছোট্ট নৌকায় তুই আর আমি ভাসছি। কুয়াশা কাটিয়ে হঠাৎ ই একটা জাহাজ দেখতে পেলাম। অনেক বাধা পেরিয়ে জাহাজটার কাছে পৌছুতেই জানলাম মাত্র এক জনের জায়গা হবে জাহাজটাতে। জাহাজ থেকে সবাই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি একবার ঐ হাতগুলোর দিকে আর একবার তোর দিকে তাকাচ্ছি। দেখলাম ছোট দুটি ঠোটে স্বর্গের বাগানের সবটুকু হাসি আর অপার বিষ্ময় ভরা  চোখে তুই আমার দিকে তাকিয়ে আছিস।দিশেহারা হয়ে পাগলের মতো ছটফট

নাহিদা আশরাফী

একজন কবি, গল্পকার এবং ছোটকাগজ সম্পাদক। তিনি কবি, সম্পাদক ও গল্পকার হিসেবে দেশে ও দেশের বাইরে সম্মানিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন বহুবার। তার মধ্যে অপরাজিত সাহিত্য পুরস্কার,উদ্ভাস সাহিত্য সম্মাননা, সমতটের কাগজ সাহিত্য সম্মাননা, আলোক সাহিত্য পুরস্কার, সাহিত্য দিগন্ত লেখক পুরস্কার , অনুষা সাহিত্য সহযাত্রী সম্মাননা (কলকাতা), বঙ্গবন্ধু স্মারক সম্মাননা (আগরতলা), যুগসাগ্নিক বর্ষসেরা সম্পাদক (কলকাতা), পিস এন্ড ওয়েলফেয়ার সম্মাননা (আসানসোল), ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফর পিস সম্মাননা (চেন্নাই) উল্ল্যেখযোগ্য। গ্রন্থতালিকা- এপিটাফ (কাব্যগ্রন্থ , ২০১৫), শুক্লা দ্বাদশী (যৌথ কবিতাগ্রন্থ,২০১৬), দীপাঞ্জলি(যৌথ কবিতাগ্রন্থ,২০১৬), মায়াবৃক্ষ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৬), প্রেম নিয়ে পাখিরা যা ভাবে (কাব্যগ্রন্থ-২০১৮), principles of sadness-বিরহসূত্র (দ্বিভাষিক কাব্যগ্রন্থ-২০২০), জাদুর ট্র্যাঙ্ক ও বিবর্ণ বিষাদেরা (গল্প, ২০২১)। সম্পাদিত গ্রন্থ- মুক্তির গল্পে ওরা এগারোজন (২০১৮), বিজয়পুরাণ (২০১৯); সম্পাদক - জলধি প্রকাশক- জলধি পরিচালক - কবিতাক্যাফে

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট