সাম্প্রতিক

জীবনবোধের নিবিড় মনস্তত্ত্বগত পর্যবেক্ষণ, গল্পগ্রন্থ- ‘ঝুলবারান্দা তিনটি মাছ আর একটি বিন্দুবর্তী জলাশয়’ । অনুপ দাশগুপ্ত

আমার কাছে গল্প মানে হলো বলার এবং গল্প মানে হলো শোনার। অনেক দিন আগে উর্দু ও হিন্দী সাহিত্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক কৃষণ চন্দরের লেখা ‘জামগাছ’ নামে অসাধারণ একটি গল্প পড়ে গল্পগ্রন্থ পড়ার প্রতি নিবিড়ভাবে অনুরক্ত হয়েছিলাম। সেই থেকে ভাল গল্পগ্রন্থের সন্ধান শুরু এবং পেয়ে গেলে গোগ্রাসেই পড়ি। এবারের একুশে বই মেলায় অসাধারণ একটি গল্পগ্রন্থের সন্ধান পাই। কোনো এক ছুঠির দিনে যা পড়তে বসে বিস্মিত হই। এরকমও গল্প লেখা যায়!

হুমায়ূন আহমেদ একবার এক আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন— ‘যে গল্প অর্ধ হতে এক বা দুই ঘণ্টার মধ্যে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা যায় তাকে ছোটগল্প বলে।’ আর ছোটগল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনপ্রিয় সংজ্ঞা তো সর্বজনবিদিত। যে-গল্প গ্রন্থটির কথা বলছিলাম তার নামটিও বেশ চিত্তাকর্ষক ও চমকপ্রদ— ‘ঝুলবারান্দা, তিনটি মাছ আর একটি বিন্দুবর্তী জলাশয়’। সাধারণত এত বড় আকারে গল্প গ্রন্থের নাম খুব একটা চোখে পড়ে না। এ ক্ষেত্রে এটাও বেশ ব্যতিক্রমী বলা চলে। গল্প গ্রন্থটির লেখক নাহিদা আশরাফী। তাঁর গল্প লেখার ঢং যেমন সহজ, সরল এবং গভীর চিন্তাশীল জীবনবোধসম্পন্ন, তেমনি তাঁর লেখায় ওঠে আসে এ বিদ্যমান ক্ষয়িষ্ণু সমাজের নানান অনুষঙ্গ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ। ‘ঝুলবারান্দা, তিনটি মাছ আর একটু বিন্দুবর্তী জলাশয়’ পড়তে বসলে যে কোন সাধারণ পাঠক শেষ না করা পর্যন্ত উঠতে পারবে না, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ১৩ টি গল্প সম্বলিত এই গ্রন্থটিতে প্রতিটি গল্পের উপজীব্য বিষয় ও আঙ্গিক বলা চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিটি গল্পের ভাষাশৈলী অতীব নিখুঁত ও বর্ণনার সাবলীল প্রবাহমানতা যে কোনো শ্রেণির পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে গল্পের শেষ পর্যন্ত। এবং পাঠক হৃদয়ে তুলবে চিন্তার অনুরণন। ছোটগল্পের সার্থকতা শিল্পীর ঘনতম জীবন প্রতীতিকে সম্পূর্ণ অখণ্ড জীবন-সন্দর্শনের ব্যাঞ্জনানুভবে ছড়িয়ে দিতে পারার অনন্য সামর্থ্যে। ছোটগল্প-শিল্পের সফলতা জীবনের বিন্দু বিম্বনে নয়, বিন্দুর সম্পূর্ণ জীবনমুক্তিতে, এক্ষেত্রে বলা যায় আলোচ্য গ্রন্থটিতে লেখক দারুণভাবে সফল। এ গ্রন্থের প্রথম গল্পটির কথা বলা যাক, গল্পটির নাম ‘রক্তজবা, বারবারা ও কালো ফুলদানি’। লেখক এ-গল্পটিতে তুলে এনেছেন বিশ্বের বুকে ঘটে যাওয়া করোনা নামক সংক্রামক মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে কী নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় অনেককেই নির্মম মৃত্যুকে বরণ করতে হয়েছে তার মর্মান্তিক চিত্র। তাছাড়াও বিধৃত হয়েছে লকডাউনে বন্দী জীবনের আর্তনাদ, পরিবারের অতি প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষগুলোর চরম নিষ্ঠুরতায় বদলে যাওয়ার করুণ কাহিনি এবং করোনায় আক্রান্ত রোগীর প্রতি নির্মম আচরণের মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক এক নিকষ কালো অধ্যায়। যা লেখক বলেছেন গল্পের নায়ক গহন ও তার প্রেমিকার স্বাপ্নিক বয়ানে। কল্পনা ও উপমার রূপকাশ্রিত বর্ণনে যা হয়ে উঠেছে ভীষণ বাস্তব। পাঠক পড়তে পড়তে ভাবতে বাধ্য হবেন যে এ যেন আমাদেরই চারপাশে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা। গল্পটির লেখনশৈলীর মুন্সিয়ানার কারণে পাঠক গল্পটি পড়া শেষ করেও কাহিনির  রেশ নিয়ে এক ঘোরের মধ্যে হাঁটতে বাধ্য হবেন।

এ-গ্রন্থের তৃতীয় গল্পটির নাম ‘খুনী’। এ গল্পে আমাদের সমাজে ব্যবিচারী পুরুষের অন্যায় ও অবিচারের প্রতি উচ্চকন্ঠ ও প্রতিবাদী এক নারীর অসাধারণ সাহসী রূপ ও ত্নপ্রত্যয়ের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, যেখানে আমরা দেখতে পাই— লম্পট পুরুষরূপী স্বামী শান্তা— ন্তার বাবা ও তার বন্ধুকে খুনের গল্প। খুনের পরে শান্তা-কান্তার মা কী অবলীলায় স্বীকারোক্তি করেন— ‘আমি আজ একটি নয় দুটি খুন করেছি,

জীবনের নিরেট সত্যটাকে যিনি স্পর্শ করতে পারেন তিনিই তো প্রকৃত গাল্পিক। এই গ্রন্থের ১৩টি গল্পের আরেকটি গল্পের নাম ‘অথচ যেখান থেকে গল্পটি শুরু হতে পারত’। এ গল্পে চরিত্রগুলোর মধ্যে একদিকে যেমন উঠে এসেছে আমাদের সমাজ ও সম্পর্কের নানাবিধ ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতা, অন্যদিকে আবার রয়েছে ব্যক্তিসত্তার উন্মীলন। ফলে গল্পটির প্রেক্ষাপট যেমন সামাজিক, তেমনি মনস্তাত্ত্বিক। ছয়টি মেয়ের একই ফ্ল্যাটে থাকা ও তাদের নিত্যদিনের সুখ, দুঃখ, ব্যথা, বেদনা, হাসি-কান্না এবং নিজেদের একেকজনের জীবনের গল্প বিধৃত হয়েছে এই গল্পটিতে। গল্পটির শুরুর বাক্যটিও  বেশ ব্যতিক্রমী ও চমকপ্রদ— ‘আত্নহত্যা করেছে গল্প— একটি বাক্যেই গল্পের গল্প শেষ হয়ে যায়।’ এ গল্পের নায়িকার নাম ‘গল্প’, যার নিজের বয়ানে পুরো গল্পটি প্রবাহিত হয়েছে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে ও  টান টান উত্তেজনায়। পাঠক হিসেবে পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে এটি পুরুষশাসিত সমাজে নিগৃহীত নারী জীবনের দুঃখগাঁথা। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্হার ক্রটির প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে, যা বর্ণিত হয়েছে গল্পের নায়িকা গল্পের সঙ্গে তথাকথিত দেশ সেরা স্কুলের কড়া নিয়ম ও প্রিন্সিপালের কাছ থেকে অমানবিক আচরণের কারণে  গল্পের আত্নহত্যার মাধ্যমে এবং  এখানেই গল্পটিরও যবনিকা পতন।  এই গল্পের নায়িকা গল্পের আত্নহত্যার মাধ্যমে লেখক এটা দেখিয়েছেন যে, কীভাবে আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে ঘরে বাইরে সর্বত্র নিগৃহীত হতে হয় ও বিপন্ন জীবনে নারীর নির্মম নিয়তিকে মেনে নিতে হয়! তাই গল্পটির শেষভাগে লেখক কী নির্মম বিষন্নতায় বলেন ”জন্মেই মৃত্যুর দরিয়ায় সাঁতার কাটা মানুষের নামেই বুঝি ‘নারী’?” কী নিদারুণ বেদনায় নারীর জীবন সম্পর্কে লেখক এ কথা বলেন, পাঠকের হৃদয় এখানেই বেদনার্ত হয়।

এ-গ্রন্থের তৃতীয় গল্পটির নাম ‘খুনী’। এ গল্পে আমাদের সমাজে ব্যবিচারী পুরুষের অন্যায় ও অবিচারের প্রতি উচ্চকন্ঠ ও প্রতিবাদী এক নারীর অসাধারণ সাহসী রূপ ও আত্নপ্রত্যয়ের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, যেখানে আমরা দেখতে পাই— লম্পট পুরুষরূপী স্বামী শান্তা-কান্তার বাবা ও তার বন্ধুকে খুনের গল্প। খুনের পরে শান্তা-কান্তার মা কী অবলীলায় স্বীকারোক্তি করেন— ‘আমি আজ একটি নয় দুটি খুন করেছি, এবং তাতে আমার আপসোস নেই, আমি অকপটে সত্যিটাই বলছি।’ যেখানে লেখক আমাদের নানা রকম আত্মজিজ্ঞাসার সম্মুখীন করে তুলে তাঁর অসাধারণ বর্ণনা শৈলীর মাধ্যমে। এবং যেখানে পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রতিটি পুরুষের সাধারণ ও স্বাভাবিকভাবে নারীর প্রতি প্রচলিত ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব চিত্র তুলে এনেছেন। এ গল্পটি আবর্তিত হয়েছে তার স্বামীর লাম্পট্যের কাহীনি ও খুনকে কেন্দ্র করে। যাতে নারীকে সবসময় দেখা হয় দেহ সর্বস্ব পণ্যরূপে। এই পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্হার প্রতি তীব্র ঘৃণার প্রতীকী রূপও চিত্রিত হয়েছে। একজন পুরুষের বহুনারীর প্রতি আসক্তি কীভাবে তাদের শোবার ঘরে পর্যন্ত নিয়ে আসে এবং সমাজকে কলুষিত করছে তার মর্ম পীড়াদায়ক বর্ণনা তো আছেই, শুধু তাই নয় ভবিষ্যৎ সমাজটি কীভাবে নারীর জন্য বিপদজনক হয়ে উঠছে তার শংকিত প্রতিকার স্বরূপ শান্তা-কান্তার বাবাকে খুন করাও যে অপরাধ নয়, তার বহুমাত্রিক মনস্বত্ত্বগত চিন্তার প্রতিফলন অতীব স্পষ্ট এই গল্পটিতে। গল্পের প্লট ও কাহীনি বিন্যাস বর্ণনার অসাধারণ শৈলীর কারণে গল্পটি পাঠক হৃদয়কে বারবার ছুঁয়ে যাবে, পাঠকের মনে বহু প্রশ্নের জন্ম দিবে- নিশ্চিত বলা যায়।

‘ঝুলবারান্দা, তিনটি মাছ আর একটি বিন্দুবর্তী জলাশয়’, যে-গল্পটির নামেই গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছে, তা একটি রহস্যময় অতিপ্রাকৃত গল্প। এ গল্পের মূল চরিত্র বিন্দু আর তিনটি মাছ। যে-মাছের সঙ্গে বিন্দুর মনস্তাত্বিক কথোপকথনে একে অন্যকে খুঁজে বেড়ায়। গল্পটি প্রথম দিকে পড়তে পড়তে মনে হবে জীবের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ও কোমল অনুভূতির সুন্দর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, যা অনেকটা মনে করিয়ে দেবে শরৎচন্দ্রের লেখা বিখ্যাত গল্প ‘মহেশ’-এর প্রতি গফুর ও আমিনার মমতার কথা বা মাহবুব-উল আলমের ‘তাজিয়া’ গল্পগ্রন্থের ‘কোরবাণী’ গল্পের ষাঁড় মুন্নার প্রতি রমিজের হৃদয়কাড়া ভালবাসার কথা। কিন্তু গল্পটি আরেকটু এগিয়ে গেলেই বোঝা যায় অতিপ্রাকৃত গল্পের রহস্যময়তার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। এ-গল্পের মূল চরিত্র বিন্দুর ফুপা এতই লোভী ছিল যে সে বিন্দুর বাবা মা’র সম্পত্তি ভোগ দখল করা জন্য শটতার আশ্রয় নেয় এবং কী অদ্ভুতভাবে বিন্দুর বাবা-মা ও ভাই হঠাৎ একদিন নিখোঁজ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। বিন্দু সেই থেকে ভাসমান। কী এক অসহনীয় জীবন বয়ে বেড়াতে বেড়াতে ক্লান্ত বিন্দুর কাছে মনে হয় তার জীবন ভাসমান মাছের মতোই! তার কাছে মনে হয় তখন মাছ তিনটির চেয়ে আপন আর কেউ নেই। তিন-তিনটি জলজ্যান্ত মানুষকে খুন করা হয়েছে নাকি গুম করেছে কেউ, নাকি কোন দুর্ঘটনার শিকার, কোনো তথ্যই পুলিশ এই দেড় বছরে বের করতে পারেনি। ফুপার বাড়িতে বেড়াতে আসা বিন্দুর খুব প্রিয় জায়গা হলো ঐ বাড়ির ঝুলবারান্দা, যাতে দাঁড়ালেই বিন্দু দেখতে পায় কাছের পুকুরে শান্ত মাছের সন্তরণ। এবং বিন্দু স্বপ্ন দেখে মাছের কোলে সে ঘুমিয়ে আছে। বা বিন্দুর কেবলই মনে হতে থাকে, কোন এক ইশারায় মাছগুলো বিন্দুকে কিছু একটা বোঝাতে চায়, বলতে চায়। বিন্দুর হিসেব নিকাশ মেলে না। এ এক রহস্যময় রোমাঞ্চ। অতিপ্রাকৃত রহস্যময় এই গল্পের শেষ ভাগে আমরা দেখতে পাই বিন্দুর বাবা-মা-ভাইয়ের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কারণ বা তারা মৃত নাকি জীবিত তার রহস্য উদঘাটনের জন্য বা তারা মৃত হলে তাদের লাশগুলো খুঁজে পাবার জন্য বিন্দু লোভী ফুপার চক্রান্তের দুষ্টু জাল থেকে কোনো এক চকচকে ঝিনুক জোছনাময় সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়ে, দ্রুত পা বাড়ায় এবং বিন্দুর মনোজগতে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে। বিন্দু এখন দূরন্ত সাহসী হয়ে ওঠে। লোভী ও শট প্রকৃতির ফুপার হাত থেকে সহজ সরল ফুপিকে বাঁচানোর ব্রত ও বিন্দুর বাবা-মা-ভাইয়ের মৃত দেহ উদ্ধার বা নিখৌঁজ রহস্য উদঘাটনের নিমিত্তে পুলিশ স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলে বিন্দু। টান টান এক উত্তেজনায় এগিয়ে চলে এই অতিপ্রাকৃত গল্পটি। এ গল্পে লক্ষ্য করার বিষয় হলো- দর্শক ও কথকের অস্বাভাবিক ভাবনা ও কল্পনা বিস্তারে একটি ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত অনুভূতির প্রকাশ। অতিপ্রাকৃত গল্পের সংজ্ঞা ও তাৎপর্য এখানে প্রকৃষ্ট রূপে বিদ্যমান। প্রখ্যাত সমালোচক প্রমথ নাথ বিশী অতিপ্রাকৃত গল্প সম্পর্কে বলেছেন— ‘অতি প্রাকৃত একটি বিশেষ রস। তাহাতে ভয় হইবে, অথচ সে রস সংবরণ করাও সহজ হইবে না। আর গল্প পড়া শেষ হইয়া গেলে অন্ধকার ঘরে একাকী প্রবেশ করিতে দ্বিধা হইবে। আরও অনেক লক্ষণ থাকিতে পারে।’ নাহিদা আশরাফীর এই গল্পটি পড়ে আমার কাছে  মনে হয়েছে বাংলা সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত গল্পের সার্থক রূপায়ন। অতি প্রাকৃত গল্প বিষয়ে আরেক সমালোচক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন— এই প্রকার গল্পের উদ্দেশ্য পাঠকের মনে একটা রহস্যময় রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি। রসের দিক থেকে একে বলা যায় বিস্ময়রস। এই বিস্ময়রসের উদ্বোধনে, এই অতিপ্রাকৃত ভৌতিক অনুভূতির সঞ্চারের মধ্যে এই শ্রেণির গল্পের সার্থকতা নির্ভর করে। যেখানে বলা যায় নাহিদা আশরাফী অত্যন্ত সফল এ গল্পে। এই অতিপ্রাকৃত গল্প পাঠ শেষ করে পাঠক মোহাবিষ্ট হয়ে পড়তে বাধ্য হবেন। অতিপ্রাকৃত গল্পের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে প্রকৃতপক্ষে যা যুক্তিতর্কের অতীত, পরিবেশ সৃষ্টিতে ও বর্ণনাগুণে  তা বাস্তবতায় পর্যবসিত হয়। এ-গল্পেও লেখক পরিবেশ সৃজনে বাস্তবতার বিভ্রান্তি চমৎকার রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ গল্পে কাব্য-মাধুর্যতা ও ভাষার অপূর্ব কারুকাজ লক্ষ্য করা যায়। বাস্তব জগতে বসে গল্পটি পাঠ করে পাঠক কখনো বা নিজেকে অতিপ্রাকৃত জগতে উপবিষ্ট মনে করবেন।

নাহিদা আশরাফীর লেখা এ-গ্রন্থটিতে প্রতিটি গল্পের নিজস্ব একটা ঢং দাঁড়িয়েছে, যার যার উপজীব্য বিষয় ও আঙ্গিক ভিন্ন ভিন্ন। যেমন আরেকটি গল্প- ‘পেনেলোপ সীতা ও আমি’; এ-গল্পে লেখক নারীর উপর ঘটে যাওয়া নিপীড়নের করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। প্রতিনিয়ত লড়াই করেছে সীতা নারীলিপ্সুকদের বিরুদ্ধে। নারী প্রশ্নে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি যে বদলায়নি, সেটি এ গল্পের মূল চরিত্র সীতাকে দিয়ে দেখিয়েছেন লেখক।

উল্লেখ্যযোগ্য আরো কয়েকটি গল্পের মধ্যে ‘প্রুফরিডার’ গল্পটির কথা না বললেই নয়। এ গল্পে প্রুফরিডার চরিত্রে লেখক দাঁড় করিয়েছেন প্রশান্ত বাবুকে। প্রশান্ত বাবু নামক এক প্রচ্ছদ শিল্পী ও প্রুফরিডারের জীবন উপাখ্যানের মাধ্যমে লেখক তুলে ধরছেন আমাদের এই চিরচেনা ও রঙবাহারি চাকচিক্যময় প্রকাশনা জগতের কৃষ্ণরূপ, নির্মম মিথ্যাচার এবং দ্বিচারী মানুষের কদাকার রূপ। যার কারণে শান্ত ভদ্র প্রুফরিডার প্রশান্ত বাবু যখন তার উপর ঘটে যাওয়া মিথ্যার বিরুদ্ধে উচ্চকিত হয়ে প্রতিবাদ করেন প্রকাশক ও তার সুন্দরী সহযোগী আল্পনার বিরুদ্ধে, মিথ্যাচারের ক্রোধে ফেটে পড়েন, তখনই নিরীহ শান্ত শিষ্ট সৃষ্টিশীল প্রুফরিডার প্রশান্ত বাবুর জীবনে নেমে আসে জেলখানার কয়েদী জীবন ও মিথ্যা মামলার হুলিয়া। এ-গল্পে প্রুফরিডার প্রাশন্ত বাবুর জীবননাটকের নির্মম পরিণতির চিত্র পরিস্ফুট হয়ে ওঠে যা আমাদের এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজে ঘটে চলা নিত্য মিথ্যাচারের সাবলীল প্রকাশ। প্রুফরিডার প্রশান্ত বাবুর নিজের সৃষ্ট প্রচ্ছদ, তাঁর নামের বদলে প্রকাশকের নারী সহযোগী আল্পনার নামে দেখে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন এবং তাতেই প্রশান্তবাবুর জীবনে নেমে আসে বিদ্যুৎতাড়িত মেঘের মত বজ্রপাত। নিজের অধিকার বঞ্চিত জীবন যাপন করে শেষমেশ জেলখানার কয়েদী জীবনেই তার স্থান হলো। এক চিরচেনা অন্যায় ও অবিচারের নিষ্টুর কাহিনি বর্ণিত হয়েছে এ গল্পে। তাই গল্পের শেষ বাক্যে কী এক বেদনায় লেখক বলেন- ‘এত এত বইয়ের প্রচ্ছদ আর প্রুফরিডিং সে কত নিখুঁতভাবে করেছে কিন্তু নিজের জীবনের প্রচ্ছদ আর প্রুফরিডিংয়ে বিরাট ভুল করে বসে আছে। শব্দ বাক্য আর রঙের কী অপরিকল্পিত, অপ্রয়োজনীয় আর অযাচিত ব্যবহার!’ সত্যিই কী অসাধারণ গল্পের ঘটনা-বিন্যাস, বর্ণনাভঙ্গি, ভাষার কারুকার্য, গল্পের গঠন-শৈলী! গল্পটিকে সার্থক শিল্পসৃষ্টি বলা যেতে পারে।

এ-গ্রন্থে আরো ৭টি হৃদয়গ্রাহী গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে, যা পাঠ করলেই পাঠক বলতে বাধ্য হবেন— গল্পের বই কী এরকমও হতে পারে! যেমন: জয়নাল মিয়ার ৫৭০, হাওয়াজীবন, বকুলের ঘ্রাণ, মধুময় বারোটা, মোনঘর, প্রত্যাশিত প্রেমিক ও একটি মৃত্যুচুম্বন এবং হাওয়াকলের গান। পাঠকের কাছে রহস্য ও চমক ধরে রাখার জন্য বাকী গল্পগুলো নিয়ে সবিস্তার আলোচনা জারি রাখা গেলো না। আর জানতে হলে পড়তে হবে এই গ্রন্থটি।

কিছু কিছু মুদ্রণ প্রমাদ গল্পগুলোর সাবলীল পাঠ পক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে এবং কিছু কিছু শব্দ বিন্যাস ছাপার ফরমেটের কারণে ছুটে গেছে, যা চোখে পড়ার মতো।ভবিষ্যতে এ দিকটির প্রতি নজর দেবেন বলে বিদ্যা প্রকাশের প্রতি আমার বিশ্বাস।

সবশেষে একথা বলতেই হয়— গল্পকার নাহিদা আশরাফী কিন্তু থেমে যাওয়ার জন্য আসেননি। বাংলা সাহিত্য একদিন তাঁর দ্বারা আরো সমৃদ্ধ হবে বলেই আমার আন্তরিক বিশ্বাস। গল্পগুলো পড়তে গিয়ে দেখেছি প্রতিটি গল্পেই তিনি এমন কিছু বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যা পাঠকসমাজের মনন ও মস্তিককে নাড়া দিয়ে যায়। তাই সকল শ্রেণির  পাঠকের কাছে আমার প্রস্তাব গল্পগুলো একবার পড়ে দেখুন।

অত্যন্ত চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদটি এ গ্রন্থের বিষয়বস্তুকে আরো দৃষ্টিগ্রাহী করেছে। প্রচ্ছদটি করছেন আইয়ুব আল আমিন। উৎসর্গপত্রটিও বেশ চমৎকার, যা তিনি উৎসর্গ করেছেন এই গল্পগ্রন্থের চরিত্রদেরকে। সর্বপরি বলা যায়— উন্নতমানের অপসেট কাগজে ছাপা ও গ্রন্থটির উন্নতমানের বাঁধাইয়ের কারণে একজন পাঠক সম্মোহিত হতে বাধ্য হবেন।

আমাদের মত সাধারণ পাঠকের জন্য এরকম একটি অসাধারণ ভাল মানের গল্প গ্রন্থ উপহার দেওয়া জন্য লেখককে জানাই অশেষ অভিনন্দন।

গল্পগ্রন্থ: ঝুলবারান্দা তিনটি মাছ আর একটি বিন্দুবর্তী জলাশয়।
লেখক: নাহিদা আশরাফী
প্রকাশ কাল : ফেব্রুয়ারি ২০২২
প্রকাশন : বিদ্যা প্রকাশ।
প্রচ্ছদ: আইয়ুব আল আমিন
মূল্য : ২৫০ টাকা।

অনুপ দাশগুপ্ত

চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানাধীন দক্ষিণ দেওয়ান পুর গ্রামে ১৯৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিষয়ে স্নাতক অনার্স ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীতে আইইউবি, ঢাকা থেকে ব্যবসা প্রশাসনে কৃতিত্বের সাথে এমবিএ পাশ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ২০০১ সালে ব্রিটিশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্ম জীবন শুরু করেন। বর্তমান আমেরিকান বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ডিজিএম হিসেবে কর্মরত আছেন। তার সাহিত্যের পাঠ শুরু হয় ছোটবেলা থেকে। বিশ্বশ্বসাহিত্য এবং বিজ্ঞান তার পাঠের একান্ত ভালবাসার জায়গা। তিনি চট্টগ্রামের বহুল প্রচারিত দৈনিক আজাদী ও অন্যান্য পত্রিকায় নিয়মিত লিখে থাকেন। ই-মেইল- anup.gupta@amefird.com.bd

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট